রায়হান সিকদার, লোহাগাড়া প্রতিনিধি : দরজার দিকে তাকালেই মনে হয়, এই বুঝি হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকবে ১৭ বছরের ছেলেটা। মুখে সেই চিরচেনা হাসি নিয়ে বলবে, মা, আমি এসেছি! কিন্তু দরজা আর খোলে না, ইশমামও আর ফিরে আসে না।
আজ ৭ আগস্ট, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের রাজপথে জীবন উৎসর্গ করা লোহাগাড়ার লড়াকু তরুণ ইশমামুল হকের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী।
দুটি বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু পরিবারের কাছে সময় যেন স্তব্ধ হয়ে আছে সেই রক্তাক্ত আগস্টেই। স্বজনদের হৃদয়ে তিনি আজও জীবন্ত, ঘরেরই একজন-যার ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রতিনিয়ত প্র প্র প্রহর গোনেন এক অশ্রুসজল মা।
তবে সেই অপেক্ষার কোনো শেষ নেই। বিচার প্রক্রিয়ায় মামলার রায় হলেও তার কার্যকর বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় ইশমামের পরিবার ও স্বজনদের মনে জমেছে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা।
চার হাজার টাকার চাকরি আর পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের দর্জিপাড়ার বাসিন্দা প্রয়াত নুরুল হকের মেজ ছেলে ইশমামুল হক।
২০১৭ সালে বাবাকে হারানোর পর সংসারের অভাব-অনটন ইশমামের পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে দেয় অসময়েই। পরিবারে তিন ভাইয়ের মধ্যে মেজ হলেও অল্প বয়সেই কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন সংসারের গুরুদায়িত্ব।
২০২৩ সালে জীবিকার তাগিদে ঢাকায় পাড়ি জমান ইশমাম। চকবাজারের একটি জুয়েলারি দোকানে কাজ নেন মাত্র চার হাজার টাকা মাসিক বেতনে।
নিজের সামান্যতম প্রয়োজন মিটিয়ে সামান্য সেই আয়ের সিংহভাগই তিনি নিয়ম করে পাঠিয়ে দিতেন মায়ের হাতে, যাতে ছোট সংসারের চাকাটা অন্তত সচল থাকে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে দেশজুড়ে নেমেছিল জনতার ঢল। ঢাকার চকবাজার থেকে শাহবাগমুখী সেই ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার মিছিলে শরিক হয়েছিলেন ১৭ বছরের অকুতোভয় তরুণ ইশমাম।
মিছিলটি চানখাঁরপুল এলাকায় পৌঁছালে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায় পুলিশ। সেই রক্তাক্ত মুহূর্তে পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন ইশমাম।
রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নিবিড় পরিচর্যা ও চিকিৎসার পর মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে ৭ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৪টায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই তরুণ বীর।
সন্তানের শূন্যতা মা কখনো ভুলতে পারে না
ইশমামের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বুকভরা স্মৃতি আর অসীম বেদনা বুকে চেপে ছেলেটির ছবি আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন মা শাহেদা বেগম।
চোখের জল মুছতে মুছতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আন্দোলনের পুরো সময়টাই সে রাজপথে ছিল। ৫ আগস্ট সকালেও মিছিলে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ পরই খবর পাই ও গুলিবিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু সেদিন গাড়িঘোড়া সব বন্ধ থাকায় লোহাগাড়া থেকে তৎক্ষণাৎ ঢাকায় ছুটতে পারিনি।
পরদিন কোনোমতে হাসপাতালে পৌঁছাই। আর তার পরদিনই আমার ছেলেটা আমাদের একা করে চলে গেল। দুই বছর পার হয়ে গেল, কিন্তু আজও মনে হয় দরজা খুলে ও ঘরে ঢুকবে। একজন মা কি কখনো সন্তান হারানোর শোক ভুলতে পারে?
ইশমামের ছবির দিকে তাকালেই কান্নায় ভেঙে পড়েন এই রত্নগর্ভা মা। সন্তানের সেই না-ফেরার স্মৃতি প্রতিদিন তাঁকে একাকী কাঁদায়।
ইশমামের বড় ভাই মুহিবুল হক বলেন, ইশমাম শুধু আমার ছোট ভাই ছিল না, ও ছিল আমাদের এই ভাঙা সংসারের সবচেয়ে বড় শক্ত খুঁটি।
নিজের খরচ বাঁচিয়ে মায়ের জন্য টাকা পাঠাত। ও আন্দোলনে যাবে জানতাম, কিন্তু এভাবে লাশ হয়ে ফিরবে-তা কখনো ভাবিনি। প্রতিটি মুহূর্তে ওর শূন্যতা আমাদের কুড়ে কুড়ে খায়।
বুকচাপা ক্ষোভ নিয়ে তিনি আরও যোগ করেন, আমরা চাই ইশমামের এই আত্মত্যাগ যেন দেশবাসী চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ যেন সত্যিই বাস্তবায়িত হয়।
কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হলো, মামলার রায় হওয়ার পরও তা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখছি না। আমরা দ্রুত এই রায় কার্যকর করে দোষীদের শাস্তির জোর দাবি জানাই।
শহীদ ইশমামুল হকের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনায় পারিবারিকভাবে কোরআনখানি, দোয়া মাহফিল ও কবর জিয়ারতের আয়োজন করা হয়েছে। এতে ইশমামের স্বজন, সহপাঠী, স্থানীয় অধিবাসী এবং আন্দোলনের সহযোদ্ধারা অংশ নেবেন।
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: বায়েজীদ বিন আখন্দ শহীদ পরিবারটির বিষয়ে বলেন, শহীদ ইশমামুল হকের পরিবারের সঙ্গে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে এবং আগামীতেও এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রক্তাক্ত দিনগুলোর দুই বছর পরও লোহাগাড়ার মানুষের হৃদয়ে অম্লান শহীদ ইশমামুল হক।
পরিবারের কাছে তিনি এক চিরন্তন হাহাকার, আর দেশের মানুষের কাছে তিনি অধিকার, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মোৎসর্গকারী এক অমর প্রতীক।
সময় গড়ালেও ইতিহাসের পাতায় স্বৈরাচারবিরোধী এই শহীদ তরুণের বীরত্বগাথা চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

