back to top

নারী সংস্কার কমিশনের ৪৩৩ সুপারিশ ফাইলবন্দি

প্রকাশিত: ০৮ মার্চ, ২০২৬ ০৮:৫০

২০২৪ সালের নভেম্বর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ১০ সদস্যের ‘নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন’ গঠন করে, যার প্রধান হচ্ছেন নারীপক্ষের নেত্রী শিরীন পারভিন হক।

এই কমিশন নারীদের সমান অধিকার, সামাজিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার, সহিংসতা হ্রাস এবং আইন ও নীতিতে বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়ন করে।

রাজনৈতিক অস্থিরতা, মতপার্থক্য ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক চাপের কারণে দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে প্রস্তুত করা নারী সংস্কার কমিশনের ৪৩৩টি সুপারিশ এখন কার্যত ফাইলবন্দি হয়ে আছে।

অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত এই কমিশন নারীর অধিকার, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্যাপক গবেষণা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারের কাছে জমা দেয়।

তবে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

বিভিন্ন পেশাজীবী, গবেষক, নারী অধিকার কর্মী এবং আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত কমিশন প্রায় এক বছর ধরে কাজ করে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মতামত সংগ্রহ, আইন ও নীতিমালা পর্যালোচনা এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে তারা ৪৩৩টি সুপারিশ প্রণয়ন করে।

কমিশনের প্রতিবেদনে নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সমান সুযোগ সৃষ্টি এবং পারিবারিক ও সামাজিক সহিংসতা প্রতিরোধে আইন শক্তিশালী করার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

এ ছাড়া সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণ এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়েও বিস্তারিত সুপারিশ করা হয়।

তবে প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই ইসলামপন্থি কয়েকটি রাজনৈতিক দল সুপারিশগুলোর কিছু অংশের বিরোধিতা করে। তাদের অভিযোগ ছিল, কমিশনের কিছু প্রস্তাব ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

এসব আপত্তির প্রেক্ষিতে সরকার বিষয়টি নিয়ে আরও পর্যালোচনার কথা জানালেও শেষ পর্যন্ত সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। ফলে পুরো প্রতিবেদনটি কার্যত নীতিনির্ধারণের টেবিলেই আটকে আছে।

নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক কমিশনের সুপারিশমালা, বিশেষ করে অভিন্ন পারিবারিক আইন ও বৈষম্য নিরসনের বিষয়গুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য জোর তাগিদ দিয়েছিলেন।

তবে কমিশনের সুপারিশমালার ব্যাপারে ধর্মীয় গোষ্ঠী ও বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা হওয়ায় এবং অন্তর্বর্তী সরকার থেকে জোরালো সমর্থন না পাওয়ায় শিরীন পারভীন হক হতাশা ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

তার মতে, এই সুপারিশমালা বাস্তবায়ন হলে নারী-পুরুষের মধ্যে প্রকৃত সমতা অর্জনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখত। কিন্তু এই সুপারিশমালা রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

নারী অধিকার কর্মীরা বলছেন, দীর্ঘ গবেষণা ও পরামর্শের মাধ্যমে তৈরি করা এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত দলিল বাস্তবায়ন না হওয়া হতাশাজনক।

তাদের মতে, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ও সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হলে এই ধরনের সুপারিশকে গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সীমিত সময় এবং রাজনৈতিক চাপের কারণে তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তবে বিষয়টি এখন নির্বাচিত সরকারের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন হিসেবে রয়ে গেছে। নতুন সরকার চাইলে এই প্রতিবেদনকে ভিত্তি করে ধাপে ধাপে সংস্কার উদ্যোগ নিতে পারে।

প্রয়োজনে বিতর্কিত বা আপত্তিকর বলে বিবেচিত সুপারিশগুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য রূপরেখা তৈরি করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী উন্নয়ন ও সমতার প্রশ্নে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংস্কার অপরিহার্য। তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য দূর করে এই সুপারিশগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের পথ খুঁজে বের করা উচিত।

অন্যথায় বহু প্রত্যাশা নিয়ে তৈরি হওয়া নারী সংস্কার কমিশনের ৪৩৩টি সুপারিশ কেবল নথির পাতাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। সূত্র-খবরের কাগজ