back to top

জঙ্গল সলিমপুরে ইতিহাসের বৃহৎ অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেপ্তার ২২

প্রকাশিত: ১০ মার্চ, ২০২৬ ১১:৪৭

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের ধরতে ইতিহাসের বৃহৎ অভিযানে নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় চার হাজার সদস্য।

গতকাল সোমবার (৮ মার্চ) ভোর থেকে নানান প্রতিবন্ধকতার মুখে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে পরিচালিত এ অভিযান পরিচালিত হয়।

অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি ২২ জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

আজ মঙ্গলবার (১০ মার্চ) দুপুরে নগরীর খুলশী থানাধীন রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ।

প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ভোর থেকে যৌথবাহিনী এলাকায় অভিযান শুরু করে। র‌্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও এপিবিএনের মোট প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্য এতে অংশ নিয়েছেন।

অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল বিশাল এই এলাকায় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং তা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।

ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ বলেন, অভিযানের সময় জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকার ‘ইয়াসিন বাহিনী’র প্রধান মো. ইয়াসিন পালিয়ে গেছে। তাকে এখনও গ্রেপ্তার করা যায়নি।

তবে রুদ্ধশ্বাস অভিযানে মোট ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জঙ্গল সলিমপুর থেকে তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র (একটি বিদেশি পিস্তল, একটি দেশীয় পিস্তল ও একটি এলজি), ২৭টি পাইপগান, ৩০টি পিস্তলের ম্যাগাজিন, অস্ত্র তৈরির ৫৭টি পাইপ, ৬১টি কার্তুজ এবং বিভিন্ন ধরনের এক হাজার ১১৩ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ১১টি ককটেল, পাইপগান তৈরির লেদ মেশিনসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

এছাড়াও ১৯টি সিসি ক্যামেরা, ৩টি ডিভিআর, ১টি পাওয়ার বক্স এবং ২টি বাইনোকুলার উদ্ধার করা হয়েছে। যা অপরাধীদের নজরদারি কার্যক্রমে ব্যবহৃত হতো বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ আরও বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী পূর্ণ অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

দুর্গম এই এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারে র‌্যাব ও পুলিশের দুটি স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আজ থেকেই দুটি ক্যাম্প থাকবে; একটি পুলিশের এবং অন্যটি র‌্যাবের।

তিনি আরও জানান, অভিযানে আলীনগর এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ে অবস্থিত সন্ত্রাসীদের আস্তানা ও অস্ত্র তৈরির কারখানাসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা হয়েছে।

পাশাপাশি আলীনগরের বিভিন্ন প্রবেশ পথ ও পাহাড়ের চূড়ায় স্থাপিত ওয়াচ টাওয়ারগুলোর কার্যক্রমও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কারণ এসব ওয়াচ টাওয়ার ব্যবহার করে অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গমনাগমন পর্যবেক্ষণ করত।

অভিযান শেষে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, অপরাধীদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ বন্ধ করা এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দুটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।

এর মধ্যে একটি এস এম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ক্যাম্পে জেলা পুলিশ ও এপিবিএনের মোট ১৩০ জন সদস্য এবং আলীনগর উচ্চ বিদ্যালয় আরআরএফ, এপিবিএন এবং র‌্যাব-৭’র মোট ২৩০ জন সদস্য রয়েছে। পাশাপাশি জঙ্গল সলিমপুরের বিভিন্ন এলাকায় চেকপোস্ট ও পুলিশি টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শিল্পাঞ্চল ও ডিবি) মো. রাসেল জানান, জঙ্গল সলিমপুর এলাকা থেকে অবৈধ অস্ত্র-বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এরমধ্যে দুটি মামলার বাদী পুলিশ ও একটি মামলার বাদী র‌্যাব। এসব মামলায় ইতোমধ্যে ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানালেন এ পুলিশ কর্মকর্তা।

এর আগে গতকাল সোমবার ভোর ৬টায় সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি’র সমন্বয়ে অভিযান শুরু হয়। অভিযানে ৫৫০ জন সেনাবাহিনীর সদস্য, ১ হাজার ৮০০ পুলিশ সদস্য, ৩৩০ এপিবিএন, ৪০০ র‍্যাব, ১২০ বিজিবি, ১৫ এপিসি, তিনটি ডগ স্কোয়াড ও তিনটি হেলিকপ্টার রিজার্ভ অংশ নিয়েছিল। প্রবেশ ও বাহিরের পথে বসানো হয়েছিল তল্লাশি চৌকি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জঙ্গল সলিমপুরের বিভিন্ন প্রবেশমুখ দিয়ে বেশ কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে অভিযান চালিয়েছে।

তবে অভিযানের শুরুতে আলীনগর এলাকায় যৌথ বাহিনীর প্রবেশ ঠেকাতেই আগে থেকেই এসব প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে। আলীনগরে ঢোকার প্রধান সড়কে একটি বড় ট্রাক রেখে দেওয়া হয়।

একই এলাকায় খালের ওপরের কালভার্টটি ভেঙে দেওয়া হয়, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যানবাহন প্রবেশ করতে না পারে। পরে খালে ইট, বালি ও সিমেন্ট ফেলে অস্থায়ীভাবে রাস্তা তৈরি করে যান চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়।

অভিযান চলাকালে নিরাপত্তার কারণে সাংবাদিকদের ঘটনাস্থলে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। বায়েজিদ লিংক রোড এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁজোয়া যান মোতায়েন রাখা হয় বলে জানিয়েছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের দুটি পক্ষ সক্রিয়। একটির নেতৃত্বে আছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অন্যটির নেতৃত্বে রোকন উদ্দিন।

গত জানুয়ারিতে ওই এলাকায় অভিযানে যাওয়া এক র‍্যাব কর্মকর্তাকে হত্যার মামলার প্রধান আসামি ইয়াসিন। আলীনগর এলাকায় তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্র।

প্রশাসনিকভাবে জঙ্গল সলিমপুর সীতাকুণ্ড উপজেলার আওতায় হলেও এলাকাটিতে প্রবেশ করতে হয় চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ থানার বাংলাবাজার এলাকা দিয়ে।

বায়েজিদ লিংক রোড হয়ে ভাটিয়ারি যাওয়ার পথে ডান দিকে জঙ্গল সলিমপুর। প্রায় তিন হাজার ১০০ একর খাস জমিজুড়ে টিলা কেটে গড়ে ওঠা এই ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ধীরে ধীরে সন্ত্রাসীদের এক ধরনের দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতে পরিণত হয়।

২০২২ সালে এ খাস জমি দখলমুক্ত করে সেখানে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, স্পোর্টস ভিলেজ, ক্রিকেট স্টেডিয়াম, আইকনিক মসজিদ ও ইকো পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেয় সরকার। তবে উচ্ছেদ অভিযানে একাধিকবার বাধার মুখে পড়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পরে সেখানে পাহাড় ব্যবস্থাপনা ক্যাম্প ও চেকপোস্ট স্থাপন করে জেলা প্রশাসন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলাকাটিতে আবারও স্থানীয় সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। কয়েক দফা সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনা ঘটে।

২০২৫ সালের ৪ অক্টোবর ভোরে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় ইয়াসিন ও রোকন-গফুর বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে ব্যাপক গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে রোকন বাহিনীর এক সদস্য নিহত ও কয়েকজন আহত হয়। এলাকায় সহিংসতার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরাও হামলার শিকার হয়েছেন।

গত ১৯ জানুয়ারি সেখানে অভিযানে গিয়ে নিহত হন র‍্যাব সদস্য মোতালেব। আহত হন আরও তিনজন। এর পরই জঙ্গল সলিমপুরে বড় ধরনের অভিযান চালাল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।