বিশেষ প্রতিবেদন : বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল নিয়ে বিভিন্ন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে এই সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন প্রত্যাশা তৈরি হলেও আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা সমালোচনা উঠে আসছে।
সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সূত্রের তথ্য-উপাত্তে সামগ্রিক পরিস্থিতির একটি জটিল চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: সহিংসতার ঊর্ধ্বগতি
মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৪২৮টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটে, যাতে নিহত হন ১৬৬ জন এবং আহত হন প্রায় ৪৬০ জন।
একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানি ঘটে ১৩৩ জনের, আহত হন সাত হাজারের বেশি মানুষ।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে হত্যা মামলার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। সার্বিকভাবে হত্যা, অপহরণ, চুরি ও ছিনতাইসহ অপরাধমূলক মামলার প্রবণতাও ঊর্ধ্বমুখী।
কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন এমএসএফের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে অন্তত ৪২৮টি মব সন্ত্রাস বা গণপিটুনির ঘটনা ঘটে, যা গত বছরের (২০২৪) তুলনায় তিন গুণ।
এ ঘটনায় ১৬৬ জন নিহত হয়েছেন ও ৪৬০ জন আহত হয়েছেন। ২২০ জনকে আহতাবস্থায় পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে।
গণপিটুনিতে নিহত ১৬২ জনের মধ্যে চুরির অপবাদ, সন্দেহে ৪১ জন, ডাকাতির অভিযোগে ও সন্দেহে ২২ জন, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির অভিযোগে ২৫ জন, ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার অভিযেগে আটজন, প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করার অভিযোগে একজন, হত্যা মামলায় অভিযুক্ত পাঁচজন, চোরাকারবারি/মাদক ব্যবসার অভিযোগে চারজন, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগকর্মী সন্দেহে এবং রাজনৈতিক রোষানলের কারণে ছয়জন, মাদক কারবারি কটূক্তি, চোরাকারবারি, অস্ত্রসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা ও সন্দেহে, জমিসংক্রান্ত বিরোধ, বাগিবতণ্ডা মনোমালিন্য, যৌন হয়রানি, পূর্বশত্রুতা এবং অন্যান্য আপরাধের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ৫৪ জন রয়েছেন। গণপিটুনির ঘটনায় আহত ৪৬০ জনের মধ্যে ৫৫ জন আওয়ামী লীগ এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ সদস্য।
রাজনৈতিক সহিংসতা : গত এক বছরে (২০২৫) দেশে শুধু রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৩৩ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। আহত হয়েছেন সাত হাজার ৫১১ জন। এর বাইরে দেশে প্রায় চার হাজার হত্যা মামলা হয়েছে। সেই সঙ্গে হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৫৩৯ জন সাংবাদিক। সূত্র পুলিশ সদর দপ্তর ও মানবাধিকার সংস্থা।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত বছর (২০২৫) সারা দেশে প্রায় চার হাজার হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১১ মাসে বিভিন্ন থানায় তিন হাজার ৫০৯টি হত্যা মামলা হয়েছে। এই হিসাবে ২০২৪ সালের প্রথম ১১ মাসের চেয়ে ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে ২৮১টি হত্যা মামলা বেশি হয়েছে। সংস্থাটির তথ্য বলছে, দেশে হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ, চুরি, ছিনতাই, দস্যুতা ও ডাকাতির ঘটনায় গত বছরের (২০২৫) আগস্ট থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ১৩ মাসে অপরাধমূলক ঘটনায় সারা দেশে ৩৯ হাজার ৯৩৬টি মামলা হয়েছে। এই হিসাবে প্রতি মাসে মামলা তিন হাজার ৭২টি। এই হিসাবে প্রতিদিন মামলা ৭২টি। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ১৩ মাসে এসব অপরাধের ঘটনায় ৩৬ হাজার ৩১৫টি মামলা হয়। এতে একই সময়ের মধ্যে আগের বছরের তুলনায় তিন হাজার ২১টি মামলা বেশি হয়।
সামাজিক অস্থিরতা ও বিচারবহির্ভূত প্রবণতা
বিশ্লেষকদের মতে, গণপিটুনির মতো ঘটনাগুলোর বৃদ্ধি সামাজিক অস্থিরতা ও বিচারবহির্ভূত প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। বিভিন্ন অভিযোগ ও সন্দেহের ভিত্তিতে এসব ঘটনা ঘটছে, যা আইনের শাসনের জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করা হচ্ছে।
অর্থনীতি: চাপের মুখে বিনিয়োগ ও ব্যাংকিং খাত
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায়, যা এক বছরের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণও ১১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে।
নীতিগত সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় ঋণের খরচ বেড়েছে, যা বেসরকারি বিনিয়োগে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এ সময়ে কয়েকশ কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন বলেও বিভিন্ন খাতে অভিযোগ রয়েছে। বিনিয়োগ প্রস্তাব কমে যাওয়া এবং পুঁজিবাজারে আস্থার ঘাটতির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানই জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে দারিদ্র্য কমেনি বরং বেড়েছে।
ব্যবসায়িক আস্থা ও নীতিগত যোগাযোগ
ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশের অভিযোগ, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পর্যাপ্ত সংলাপের অভাব রয়েছে, যা বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। তবে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সব ক্ষেত্রে স্পষ্ট নয়।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও চুক্তি নিয়ে বিতর্ক
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত একটি বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তির কিছু শর্ত দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। একইভাবে জ্বালানি খাতে এলএনজি আমদানি সংক্রান্ত চুক্তির মূল্য নির্ধারণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
উন্নয়ন প্রকল্প: ধীরগতি ও বিলম্ব
দেশের কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের উৎপাদন শুরুর সময়সূচি পেছানো, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুতে বিলম্ব এবং অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পে অগ্রগতির ধীরগতি এ আলোচনায় উঠে এসেছে।
সামাজিক খাত: মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার চাপ
উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। স্বাস্থ্যসহ সামাজিক খাতে সেবার মান ও প্রাপ্যতা নিয়েও বিভিন্ন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল নিয়ে মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, একদিকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলেও অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
পরিস্থিতির উন্নয়নে কার্যকর নীতিনির্ধারণ, অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।


