চট্টগ্রাম নগরের ডবলমুরিং এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিসে দেড় কোটি টাকা চুরির ঘটনায় গ্রেপ্তার চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কার্যক্রমের ইঙ্গিত পেয়েছে পুলিশ।
তবে ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) থেকে শুক্রবার (৩ এপ্রিল) পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে নগদ ৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা এবং ২ হাজার মার্কিন ডলার উদ্ধার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন-ভোলার দৌলতখান থানার মিদ্দারহাট বাজারের দিদারুল্লাহ পলফন বাড়ির মো. শাহাব উদ্দিনের ছেলে মো. শাওন (২৩), চাঁদপুরের কচুয়া থানার খাদিজা মাজার কলাখাল এলাকার মো. কাশেমের ছেলে মো. হৃদয় ওরফে সাগর (২০), নগরের সদরঘাট থানার পশ্চিম মাদারবাড়ীর ৩ নম্বর স্ট্যান্ড রোড বাস্তহারা এসআরবি কলোনির মো. বাবুল ওরফে বাবু মিয়ার ছেলে মো. রাসেল ওরফে চেগা রাসেল (২৩) এবং ভোলার বোরহানউদ্দিনের মধ্যমতলী, জাহার আলী সরদার বাড়ির মাহফুজুল হকের ছেলে মো. ইমাম হোসেন (৪৪)।
এদের মধ্যে মো. শাওন নগরের পশ্চিম মাদারবাড়ীর এসআরবি ছোট মাঠ এলাকায়, মো. হৃদয় ওরফে সাগর সীতাকুণ্ডে, চেগা রাসেল নগরের আতুরার ডিপোর সামাদপুর ও মো. ইমাম হোসেন ডবলমুরিং থানার রশিদ বিল্ডিং ২নং গলির ফজল হকের কলোনির ভাই ভাই মঞ্জিলের ৩য় তলায় থাকেন।
যেভাবে চুরি:
মামলার এজাহার ও পুলিশি তদন্তে জানা যায়, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি রাত। নগরের আগ্রাবাদ মোড়ের একটি বহুতল ভবনের তৃতীয় তলায় অবস্থিত নবাব অ্যান্ড কোম্পানি ও এনসি শিপিংয়ের অফিসকে টার্গেট করে চক্রটি। ভবনের দক্ষিণ পাশের জানালার গ্রিল কেটে ভেতরে ঢুকে তারা।
পরদিন সকালে কর্মীরা এসে দেখতে পান, অফিস এলোমেলো, ফাইল ছড়ানো, ক্যাবিনেট ভাঙা। পরে হিসাব করে দেখা যায়, ১ কোটি ৪৩ লাখ ১০ হাজার টাকা, তিনটি এফডিআর সনদ এবং একটি ডিভিআর উধাও।
তদন্তে উঠে এল ভাগ-বাটোয়ারার তথ্য:
ঘটনার পরদিনই মামলা হয়। তবে অগ্রগতি আসে প্রায় এক মাস পর, যখন পশ্চিম মাদারবাড়ী এলাকা থেকে শাওনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে শাওন যে তথ্য দেন, তাতেই খুলতে শুরু করে রহস্যের জট। তিনি জানান, তিনজন মিলে চুরি করলেও পুরো পরিকল্পনার নেপথ্যে ছিলেন মনির হোসেন নামের একজন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চুরির পর একটি পরিত্যক্ত কক্ষে বসে লুট করা টাকা ভাগ করা হয়। প্রত্যেকে পান ৭ লাখ টাকা ও ৩ হাজার ডলার করে।
আশ্রয়দাতা হিসেবে ইমাম হোসেন পান ২ লাখ টাকা ও ১ হাজার ডলার। বাকি অর্থ নিজের কাছে রেখে দেন মনির।
গ্রেপ্তার ও উদ্ধার :
শাওনের তথ্যের ভিত্তিতে বারিক বিল্ডিং এলাকায় অভিযান চালিয়ে হৃদয় ও রাসেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে যথাক্রমে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও ১ হাজার ডলার, এবং ৩ লাখ টাকা ও ৫০০ ডলার উদ্ধার করা হয়।
পরদিন বাংলাবাজার এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ইমাম হোসেনকে। তার দেওয়া তথ্যে একটি তেলের ডিপোর কক্ষ থেকে আরও ৪২ হাজার টাকা ও ৫০০ ডলার উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রশ্ন রয়ে গেছে?
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চক্রটি আগে থেকেই অফিসটির অবস্থান, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অর্থের উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা রাখত কি না—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা দুর্বল ছিল, রাতের পাহারার কোনো ঘাটতি ছিল কি না, কিংবা ভেতরের কোনো সূত্র থেকে তথ্য ফাঁস হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
যা বলছে পুলিশ:
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) জানিয়েছে, এ ঘটনায় জড়িত চক্রটির মূলহোতা মনির হোসেন এখনও পলাতক। তাকে গ্রেপ্তার এবং অবশিষ্ট টাকা উদ্ধারে অভিযান চলছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, “গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পুরো চক্রটিকে আইনের আওতায় আনতে কাজ চলছে।”
এ ঘটনায় নগরজুড়ে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।


