অভিযোগ, ভাঙন, নতুন নেতৃত্ব-বিসিবিতে বড় পরিবর্তনের গল্প

তামিমের কাঁধে বিসিবি: বিতর্কের পর নতুন যুগের সূচনা

প্রকাশিত: ০৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১৬:৫৬

বিশেষ প্রতিবেদন : নির্বাচনে অস্বচ্ছতার অভিযোগে মাত্র ছয় মাসের মাথায় ভেঙে দেওয়া হয়েছে আমিনুল ইসলাম বুলবুল-এর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)-এর পরিচালনা পর্ষদ।

এর পরপরই বোর্ড পরিচালনার জন্য গঠন করা হয়েছে নতুন একটি অ্যাডহক কমিটি। এই কমিটির নেতৃত্বে আনা হয়েছে বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল-কে।

তাঁর নেতৃত্বে ১১ সদস্যের এই কমিটি আগামী তিন মাস বিসিবির কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

কারা আছেন নতুন কমিটিতে :
অ্যাডহক কমিটিতে তামিমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বিভিন্ন অঙ্গনের পরিচিত মুখ। তাদের মধ্যে রয়েছেন—বিএনপির সংসদ সদস্য ববি হাজ্জাজের স্ত্রী আইনজীবী রাশনা ইমাম। কমিটিতে আছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসের ছেলে মির্জা ইয়াসির আব্বাস, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ছেলে সাঈদ ইব্রাহিম আহমদ ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদের ছেলে ইসরাফিল খসরু।

এছাড়াও অ্যাডহক কমিটিতে ক্রিকেট অঙ্গনের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাও রয়েছেন। তারা হলেন-জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন, জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার ও ধারাভাষ্যকার আতহার আলী খান, এর আগে বিভিন্ন সময়ে বিসিবির পরিচালনা পর্ষদে থাকা তানজিল চৌধুরী, সালমান ইস্পাহানি, রফিকুল ইসলাম ও ফাহিম সিনহা।

দায়িত্ব নেওয়ার পর তামিমের প্রথম দিন :
দায়িত্ব পাওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মিরপুরে বিসিবি কার্যালয়ে উপস্থিত হন তামিম। সেখানে ভিড় জমান শত শত ক্রিকেটপ্রেমী। স্লোগান আর উচ্ছ্বাসের মধ্যেই নতুন দায়িত্বের সূচনা করেন তিনি।

জানা গেছে, নতুন দায়িত্ব পাওয়ার ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যই গতকাল মঙ্গলবার রাতে বিসিবি কার্যালয়ে আসেন তামিম।

মিরপুরের বিসিবি কার্যালয়ের সামনে তখন ছোট ছোট জটলা। শত শত মানুষের ভিড়। কারও কারও কণ্ঠে স্লোগান। তামিম ইকবালের নেতৃত্বে বিসিবির নতুন অ্যাডহক কমিটিকে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছেন তাঁরা।

কালো ব্লেজার পরে গাড়ি থেকে নামতেই তামিমকে ঘিরে ধরে অসংখ্য ক্যামেরা। অবশ্য খেলোয়াড়ি জীবনের শুরু থেকে তারকাখ্যাতি পাওয়া এই সাবেক অধিনায়ক তাতেই অভ্যস্ত।

ভিড় পেরিয়ে বিসিবি কার্যালয়ে গিয়ে তামিম বসেন সভাপতির চেয়ারে। পরে অ্যাডহক কমিটির ১১ সদস্য নিয়ে বোর্ড সভায় বসেন তামিম। সভাপতির আসনে বসে কমিটির সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করেন তামিম।

সভা শেষে সিদ্ধান্ত হয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা International Cricket Council (আইসিসি) এবং Asian Cricket Council (এসিসি)-তে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হবেন তিনিই। বোর্ডের মুখপাত্র করা হয়েছে তানজিল চৌধুরীকে।

তামিমের লক্ষ্য কী?
সভা শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় তামিম ইকবাল বলেন, ‘সাধারণত এমন দায়িত্ব পেলে অনেকেই ডেভেলপমেন্টসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন; কিন্তু আমি ও আমার দল একসঙ্গে অনুভব করছি।

তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশ ক্রিকেটের হারানো সুনাম ফিরিয়ে আনা এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করাই হবে তাঁর দলের প্রধান লক্ষ্য।

গত দেড় বছরে দেশের ক্রিকেটের যে সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে, সেটি পুনরুদ্ধার করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

২০ মাসে তিন নেতৃত্ব,সবশেষ তামিম:
আগের ১২ বছরে একজন পাপনকে সভাপতি হিসেবে দেখা বিসিবি গত ২০ মাসেই নেতৃত্বে পেয়েছে তিনজনকে। তামিমের আগের দুজন আমিনুল আর ফারুকও তাঁর মতোই ছিলেন সাবেক অধিনায়ক।

তাদের ব্যর্থতা নিয়ে সরব তামিমের কাঁধে এবার এসে পড়েছে ক্রিকেট বোর্ডের ভার। যে চ্যালেঞ্জটা তিনি নিজেই নিতে চাইছিলেন অনেক দিন ধরে।

যে কারণে ভেঙ্গে দেওয়া হয় আগের বোর্ড?
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)-এর তদন্তে বিসিবির নির্বাচনে বিভিন্ন অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল—ই-ভোটিংয়ে কারচুপি, সরকারি হস্তক্ষেপ ও ক্ষমতার অপব্যবহার।

এর আগে গত বছরের ৬ অক্টোবরের সর্বশেষ পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনে বেশ তোড়জোড় করেই বোর্ড পরিচালক হতে মাঠে নেমেছিলেন তামিম। বোর্ড সভাপতি হওয়ার লক্ষ্যের কথাও জানিয়ে দিয়েছিলেন পরিষ্কার। কিন্তু নির্বাচনী ‘কৌশলে’ ঠিক পেরে ওঠেননি। যে কারণে শেষ মূহূর্তে জোটবদ্ধভাবে সরে দাঁড়ান নির্বাচন থেকে।

কিন্তু সব ডিঙিগয়ে নির্বাচন সম্পন্ন হয়। বিসিবি সভাপতি হয়েছিলেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম। তবে সে নির্বাচন নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। অনিয়ম দুর্ণীতিরও অভিযোগ ওঠে।

শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে সরকারি হস্তক্ষেপ, ই-ভোটিং নিয়ে কারচুপি এবং বুলবুলের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের কথা জানিয়ে বিসিবির সর্বশেষ নির্বাচিত কমিটি ভেঙ্গে দেয় সরকার। তামিম ইকবালকে প্রধান করে ১১ সদস্যের অ্যাড-হক কমিটি গঠন করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)।

ঢিমেতালে চলা বিসিবির এ কমিটি ভেঙে যেতে পারে, এমন গুঞ্জন কয়েক দিন ধরেই ছিল। তবে তা যে এত দ্রুত হবে, সেটি সম্ভবত ভাবতে পারেননি আমিনুলের বোর্ডের পরিচালকেরা।

এনএসসির বক্তব্য : 
এনএসসির পরিচালক (ক্রীড়া) আমিনুল এহসান জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটি নাকি বিসিবির তিন ক্যাটাগরির নির্বাচনেই অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে।সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ‘অযৌক্তিক’ হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়ার কথাও আছে তদন্ত প্রতিবেদনে।

আমিনুল এহসান জানান, তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ২০১৮ সালের জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ নীতিমালার ২১ ধারা অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী, এনএসসি তাদের অধীন কোনো ক্রীড়া সংস্থায় অনিয়ম খুঁজে পেলে যেকোনো ব্যবস্থা নিতে পারে।

সদ্য সাবেক নির্বাচিত সভাপতি আমিনুল ইসলামের পাল্টা অবস্থান :
গতকাল রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নিজেকে এখনো ‘বিসিবি সভাপতি’ দাবি করে আমিনুল ইসলাম তদন্ত প্রতিবেদনকে ‘তথাকথিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবরের নির্বাচনে কোনো অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেছেন।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে অবিলম্বে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপের আহ্বানও জানিয়েছেন আমিনুল ইসলাম।

বিসিবির ভাবমূর্তি রক্ষায় চ্যালেঞ্জ :
তামিমের নেতৃত্বে তিন মাসের জন্য দায়িত্ব পাওয়া এই অ্যাডহক কমিটির সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ—এক বিসিবির ভাবমূর্তি পুনর্গঠন ও আরেকটি হলো একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই সন্ধিক্ষণে তামিম ইকবাল কতটা সফল হন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি