চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত চট্টগ্রামভিত্তিক একটি শীর্ষস্থানীয় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি এলবিয়ন গ্রুপ দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ওষুধ উৎপাদন করে আসছে।
অতীতে একাধিকবার কারখানা সিলগালা, ওষুধ বাজারজাত স্থগিত হলেও বর্তমানেও তাদের নাম জড়িত হয়েছে ভেজাল ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিকের অমিল এবং ব্যথানাশকের মাত্রার ঘাটতি নিয়ে।
জাতীয় পরীক্ষাগারের সর্বশেষ পরীক্ষায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। তাদের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মিমক্স ৫০০ এমজি ক্যাপসুলে অ্যামোক্সিসিলিন নেই—বরং রয়েছে অজানা মানবহির্ভূত পাউডার।
২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (আইপিএইচ)-এর ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে আসে।
একই সঙ্গে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে কম মাত্রার ইনডোমেথাসিন ও অস্বাভাবিক কম দামে বিক্রি হওয়া অন্যান্য ওষুধ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি ঝুঁকি তৈরি করছে।
অ্যান্টিবায়োটিকে ‘অজানা পাউডার’
আইপিএইচ এর প্রতিবেদনে বলা হয়, মিমক্স ৫০০ এমজি (অ্যামোক্সিসিলিন) ক্যাপসুলের ব্যাচ নম্বর ০১১২১২ পরীক্ষায় দেখা গেছে, ক্যাপসুলে ঘোষিত অ্যামোক্সিসিলিন নেই। ক্যাপসুলের গড় ওজন পাওয়া গেছে ৩৯০.২ মিলিগ্রাম, তবে কার্যকর উপাদান অনুপস্থিত।
ল্যাব প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়—“ইহা মানবহির্ভূত, অ্যামোসিলিন শনাক্ত হয়নি।”
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে রোগীর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বদলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। এতে চিকিৎসা ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি প্রাণহানির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ব্যথানাশকেও মানহীনতা
শুধু অ্যান্টিবায়োটিক নয়, একই প্রতিষ্ঠানের ব্যথানাশক ওষুধেও পাওয়া গেছে বড় ধরনের ঘাটতি।
ইনডোমেথাসিন ক্যাপসুলে ঘোষিত মাত্রা ২৫ মিলিগ্রাম হলেও পরীক্ষায় পাওয়া গেছে ২৪.১১ মিলিগ্রাম ও ২২.৫৯ মিলিগ্রাম। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কম।
তদন্তের আশ্বাস, প্রশ্ন রয়ে গেছে
নথি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাঈম গোলদার বলেন, অভিযোগের পক্ষে যথাযথ প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) আশরাফ হোসেন জানান, নতুন করে নমুনা সংগ্রহ করে পুনরায় পরীক্ষা চলছে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে—জাতীয় পরীক্ষাগারের এমন প্রতিবেদনের পরও কেন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?
‘ডিসপ্রিন’-এর ছায়ায় ‘এসপ্রিন’
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর নিষিদ্ধ ঘোষিত ‘ডিসপ্রিন’ বন্ধ হওয়ার পর বাজারে এসেছে প্রায় একই ধরনের একটি ট্যাবলেট ‘এসপ্রিন’। এলবিয়ন ল্যাবরেটরীজ লিমিটেড (উৎপাদন লাইসেন্স নম্বর—জৈব-১০৯ ও অজৈব-১৯১) দীর্ঘদিন ধরে এ ওষুধ বাজারে ছেড়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, এই ট্যাবলেট পানিতে দ্রবীভূত হয় না, যা এর কার্যকারিতা ও মান নিয়ে নতুন করে সন্দেহ তৈরি করেছে।
অস্বাভাবিক কম দামে বিক্রি
তথ্য অনুযায়ী, এলবিয়ন গ্রুপের ওষুধ লেবেলে মুদ্রিত মূল্যের তুলনায় বাজারে অস্বাভাবিক কম দামে বিক্রি হচ্ছে। যেমন—ডমপ (ডমপেরিডোন ১০ মি.গ্রা): ২০০ টাকার বক্স ৬৫ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। একইভাবে প্যানটোপ্রাজল-২০: ২১০ টাকার বক্স ৭০ টাকায়, ডাইক্লোফেনাক SR: ৩০০ টাকার বক্স ৯০ টাকায়, সেটিরিজিন: ২৫০ টাকার বক্স ৭০ টাকায়, ডেসলোরাটাডিন: ৪০০ টাকার বক্স ৯৫ টাকায়, ডেক্সামেথাসন: ২০০ টাকার বক্স ৬৫ টাকায়, ক্যালসিয়াম-ডি: ৩৬০ টাকার বক্স ৯৫ টাকায়, লটিল-২০: ৪০০ টাকার বক্স ১০০-১১০ টাকায়, লটিল-৪০: ২৪০ টাকার বক্স ৯০ টাকায়, নাইট্রাম: ১০০ টাকার বক্স ৩০ টাকায়, টলসিড: ২৪০ টাকার বক্স ১১০-১২০ টাকায়, ন্যাপ্রোক্সেন প্লাস: ৩৬০ টাকার বক্স ১৪০-১৫০ টাকায় বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
এসব ওষুধ চট্টগ্রামের হাজারীগলি ও ঢাকার মিটফোর্ড এলাকার পাইকারি বাজারে নিয়মিত বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একই নম্বর, ভিন্ন ওষুধ
আরও অভিযোগ রয়েছে, দুটি ভিন্ন ওষুধে একই এমএ নম্বর ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন—সেটিরিজিন ১০ মি.গ্রা এবং ডেসলোরাটাডিন ৫ মি.গ্রা—এই দুই পৃথক ওষুধে একই নম্বর দেওয়া হয়েছে।
অতীতেও অনিয়ম
এলবিয়ন গ্রুপের বিরুদ্ধে এর আগেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে উৎপাদিত ডাইক্লোফেনাক টিআর ক্যাপসুল, ডি-ক্যাপসুল (ডক্সিসাইক্লিন), গ্লাইসোফুলভিন ট্যাবলেট, এলফ্লাম (আইবুপ্রোফেন) নামক চারটি ওষুধের উৎপাদন ও বাজারজাত স্থগিত করা হয়। ২০০৯ সালে নিম্নমানের পলিভিট সিরাপ বন্ধ করা হয়।
এছাড়া চট্টগ্রামের চাঁদগাঁও এলাকায় একবার ভ্রাম্যমাণ আদালত কারখানাটি সিলগালা করেছিল। পরে নতুন করে সীতাকুণ্ডে কারখানা স্থাপন করা হয়।
জবাব মেলেনি
অভিযোগের বিষয়ে জানতে এলবিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান রাইসুল উদ্দীন সৈকতের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ব্যর্থ হয় প্রতিবেদক : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে বার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
তবে তিনি প্রতিবেদকের কাছে তার মতামত দিলে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে ওষুধ উৎপাদনে গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (জিএমপি) লঙ্ঘন হচ্ছে।
তাদের মতে, সময়মতো কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার ফলে বাজারে নিম্নমানের ওষুধের বিস্তার ঘটেছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে জনস্বাস্থ্য বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
প্রশ্ন একটাই—জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আর কতদিন অপেক্ষা করবে?
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



