back to top

বিদেশে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নে ধাক্কা, দেশে আটকা অর্ধশত শিক্ষার্থী!

কিরগিজ ভিসা জটিলতা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৫ এপ্রিল, ২০২৬ ০৫:৩২

প্রশাসনিক কাজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় অল্প সময়ের জন্য দেশে ফিরে এসে ভিসা জটিলতায় পড়েছেন কিরগিজস্তানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া অর্ধশত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাভাবিক এই প্রক্রিয়াই তাদের জন্য হয়ে উঠেছে দুঃস্বপ্ন—ফেরার সময় নতুন ভিসার আবেদন বাতিল হওয়ায় তারা এখন দেশে আটকা।

ইতোমধ্যে ৪ থেকে ৯ সেমিস্টার শেষ করা অনেক শিক্ষার্থী পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়; দুই বছরে ২০ লাখ টাকার বেশি ব্যয় করেও ঝুঁকিতে পড়েছে তাদের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন। সূত্র: এখনটিভি

বিশ্ববিদ্যালয় বদল, আর সেখানেই বিপত্তি
ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে কিরগিজস্তানে পাড়ি জমানো আব্দুস সাত্তার। চারটি সেমিস্টার শেষ করতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার ডলার।

বাবার পেনশনের টাকায় কোনোভাবে পড়াশোনা চালালেও বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছিল। টিউশন ফি কমাতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

কিন্তু সেই সিদ্ধান্তই এখন তার জীবনের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছুটিতে দেশে ফিরে এসে তিনি জানতে পারেন, তার ভিসার মেয়াদ শেষ। নতুন ভিসার জন্য আবেদন করলে সেটি বাতিল হয়ে যায়। প্রায় এক বছর ধরে তিনি দেশে আটকা।

সাত্তার বলেন,‘পরীক্ষা শেষ ছুটিতে আমি দেশে চলে আসি। যখন আমি ফেরত যাব তখন আমার ভিসার মেয়াদ শেষ। নতুন ভিসার জন্য যখন আমি আবেদন করি তখন দেখি আমার ভিসা বাতিল হয়ে গেছে।’

একই সমস্যায় অর্ধশত শিক্ষার্থী
সাত্তারের মতো আরও প্রায় অর্ধশত শিক্ষার্থী একই সংকটে পড়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ জন বর্তমানে দেশে অবস্থান করছেন। কেউ কেউ ইতোমধ্যে এমবিবিএস কোর্সের ৪ থেকে ৯ সেমিস্টার শেষ করেছেন।

শাহনাজ নামের এক শিক্ষার্থী বলেন,‘এতগুলো সেমিস্টারে এতগুলো টাকা দেওয়ার পর এখন আমাদের সামনে কী আছে তা অনিশ্চিত। আমরা জানি না কবে এর সমাধান পাবো।’

দীর্ঘদিন দেশে আটকে থাকার কারণে তাদের সেমিস্টার নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়েও তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।

আরেক শিক্ষার্থী বলেন,‘আমার ইচ্ছাটা কি পূরণ করতে পারবো না? এ প্রশ্নটা প্রতিদিন আমাদের মাথায় থাকে।’

বিপুল ব্যয়, অনিশ্চিত ফল
কিরগিজস্তানের স্বীকৃত ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে শতাধিক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। অনেকেই প্রায় ৬ হাজার ডলারের প্যাকেজে সেখানে যান।

পাঁচ বছরে ১০ সেমিস্টার শেষ করতে মোট খরচ পড়ে ২০ থেকে ৩০ হাজার ডলার। এর মধ্যে শুধু টিউশন ফি বাবদই প্রায় ৩৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়।

দেশে আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের অনেকেই ইতোমধ্যে দুই বছরে ২০ লাখ টাকার বেশি খরচ করেছেন। ফলে আর্থিক চাপের পাশাপাশি মানসিক চাপও বাড়ছে দিন দিন।

দূতাবাসের তৎপরতা, তবু সমাধানহীনতা
সমস্যার সমাধানে শিক্ষার্থীরা উজবেকিস্তানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের শরণাপন্ন হন। দূতাবাস কিরগিজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ভিসা নবায়নের সুযোগ দিতে একাধিকবার চিঠি পাঠিয়েছে। তবে এখনো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

উজবেকিস্তানে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব শুকলা বণিক বলেন, ‘আমাদের ফরেইন মিনিস্ট্রি থেকে ২২/২৩ জনের একটা তালিকাও পেয়েছি। সেটাসহ আমরা একাধিকবার নোট ভার্বাল দিয়েছি। তাদের কাছ থেকে কোনো রিপ্লাই পাইনি। আশা করছি এ মাসে আমাদের অ্যাম্বাসেডর যাবেন।’

সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগ
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট সরকারের সঙ্গে তারা যোগাযোগ রাখছেন। যেসব শিক্ষার্থী এখানে আটকা পড়েছে তারা যেন নিরাপদে ফেরত যেতে পারে, সে বিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে কাজ চলছে।’

স্বপ্ন টিকে থাকবে তো?
বিদেশে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যাওয়া এসব শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর।

ভিসা জটিলতার সমাধান হবে কি না, নাকি বিপুল অর্থ ও সময় ব্যয়ের পরও স্বপ্ন ভেঙে যাবে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।

শিক্ষার্থীদের ভাষায়, তাদের এই লড়াই শুধু ভিসা পাওয়ার জন্য নয়, বরং নিজেদের বহুদিনের লালিত স্বপ্নটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি