প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির সরাসরি সমাধান এবং তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি জানাতে দেশে প্রথমবারের মতো ‘প্রবাসীদের জন্য অনলাইন গণশুনানি’ আয়োজন করেছে জেলা প্রশাসন।
বুধবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এ গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
গণশুনানিতে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। জেলার সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও অনলাইনে যুক্ত হন।
বিদেশে অবস্থানরত ১১ জন প্রবাসী সরাসরি অংশ নিয়ে তাঁদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। এসব সমস্যার মধ্যে ছিল জমিজমা–সংক্রান্ত বিরোধ, অর্থ আত্মসাৎ, পারিবারিক জটিলতা, চাঁদাবাজি এবং মিথ্যা মামলা।
অভিযোগ শোনার পর জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। যেসব বিষয়ে তদন্ত প্রয়োজন, সেগুলোতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘প্রবাসীরা অকুতোভয় যোদ্ধার মতো পরিবার থেকে দূরে থেকে দেশের জন্য রেমিট্যান্স পাঠান।
তাঁদের পাঠানো অর্থেই দেশের অর্ধেকের বেশি আমদানি ব্যয় মেটানো হয়। তাঁদের এই ত্যাগ ও অবদানকে সম্মান জানাতেই আমরা এই গণশুনানির আয়োজন করেছি।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত তিনটি খাত—গার্মেন্টস, প্রবাসী আয় ও কৃষির ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্বের প্রায় ১৬৫টি দেশে বসবাসরত দেড় কোটির মতো প্রবাসী বাংলাদেশি অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন।
গণশুনানিতে কাতারপ্রবাসী রাঙ্গুনিয়ার রানা সুশীল আত্মসাতকৃত অর্থ উদ্ধারের আবেদন জানান।
বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট থানা ও উপজেলা প্রশাসনকে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘প্রবাসে কঠোর পরিশ্রমের পরও অনেক প্রবাসী পরিবার ও সম্পত্তি–সংক্রান্ত সমস্যার কারণে মানসিক অস্থিরতায় ভোগেন।
এসব সমস্যা দ্রুত ও কার্যকরভাবে সমাধানের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
তিনি জানান, প্রবাসীদের লিখিত অভিযোগ আগেই সংগ্রহ করা হয়। পরে মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসের মাধ্যমে আবেদনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ‘শুধু অভিযোগ শোনা নয়, দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।’
প্রযুক্তির সুবিধায় প্রবাসীরা দূরে থেকেও সরাসরি প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছেন উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমরা তাঁদের জানাতে চাই—তাঁরা দূরে নন, আমরা তাঁদের পাশেই আছি।’
প্রবাসীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে প্রতি বুধবার নিয়মিত গণশুনানির পাশাপাশি প্রাথমিকভাবে এক ঘণ্টা সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে এ সময় আরও বাড়ানো হবে বলে জানান তিনি।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রবাসীদের অভিযোগের বেশির ভাগই জমি দখল, অর্থ আত্মসাৎ, মিথ্যা মামলা ও চাঁদাবাজি–সংক্রান্ত।
অনেক প্রবাসী দেশে থাকা তাঁদের সম্পত্তি দখল ও হয়রানির শিকার হওয়ার কথাও জানিয়েছেন।
ওমানপ্রবাসী নুর মোহাম্মদ সম্পত্তি জবরদখল ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করেন। কাতারপ্রবাসী মোহাম্মদ আনোয়ার নিজস্ব সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা এবং প্রাণনাশের হুমকির কথা জানান।
সৌদি আরব, দুবাই ও আবুধাবিতে অবস্থানরত আরও কয়েকজন প্রবাসী একই ধরনের অভিযোগ তুলে ধরেন।
এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। তাঁদের সম্পত্তি ও অধিকার রক্ষায় প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।’
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, সাপ্তাহিক গণশুনানিতে অনেক মানবিক আবেদন তাৎক্ষণিকভাবে নিষ্পত্তি করা হয়। জরুরি ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়।
অন্যান্য সমস্যার সমাধানে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং অগ্রগতি সম্পর্কে আবেদনকারীদের অবহিত করা হয়।
এই উদ্যোগের ফলে জেলা প্রশাসনের গণশুনানিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
গণশুনানিতে উপস্থিত ছিলেন উপপরিচালক (স্থানীয় সরকার) গোলাম মাঈনউদ্দিন হাসান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মো. কামরুজ্জামান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) পাঠান মো. সাইদুজ্জামান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শিল্পাঞ্চল ও ডিবি) মো. রাসেল।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



