back to top

মানবতার কবি রমেশ শীল আজও কেন প্রাসঙ্গিক

প্রকাশিত: ০৭ মে, ২০২৬ ১৫:০৩

মানস চৌধুরী।।। বাংলার লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে কিছু নাম সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে চিরকালীন হয়ে ওঠে। কবিয়াল রমেশ শীল তেমনই এক কিংবদন্তি, যিনি কেবল একজন লোককবি নন। তিনি ছিলেন মানবতার কণ্ঠস্বর, গণমানুষের প্রতিনিধি এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল প্রতীক। আজকের বিভক্ত, অস্থির ও সহিংস পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে তাঁর জীবন ও দর্শন নতুন করে আমাদের ভাবায়। তাই মৃত্যুর বহু দশক পরও রমেশ শীল আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

১৮৭৭ সালের ৯ মে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পূর্ব গোমদণ্ডী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই মহান কবিয়াল। দরিদ্র পরিবারে জন্ম হলেও তাঁর চিন্তা ছিল অসাধারণ উচ্চতার। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুব বেশি দূর এগোয়নি, কিন্তু জীবনই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়। মানুষের দুঃখ-কষ্ট, সমাজের বৈষম্য, শোষণ ও বিভেদ তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। আর সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর গানকে দিয়েছে প্রতিবাদের ভাষা ও মানবতার শক্তি।

রমেশ শীলের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। যখন সমাজ ধর্মীয় বিভাজনে আক্রান্ত, তখন তিনি গেয়েছেন সম্প্রীতির গান। তিনি বিশ্বাস করতেন—মানুষের পরিচয় ধর্মে নয়, মানবতায়। তাঁর গানে উঠে এসেছে হিন্দু-মুসলমানের মিলন, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক ভালোবাসার কথা। আজ যখন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতা সমাজকে অস্থির করে তুলছে, তখন রমেশ শীলের দর্শন আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।

তিনি শুধু শিল্পী ছিলেন না; ছিলেন সময়সচেতন প্রতিবাদী কণ্ঠ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ—সব ঐতিহাসিক ঘটনাই তাঁর গানে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি কবিগানকে কেবল বিনোদনের জায়গায় সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং এটিকে রূপ দিয়েছেন গণসচেতনতার শক্তিশালী মাধ্যমে। তাঁর গান সাধারণ মানুষকে ভাবতে শিখিয়েছে, প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহস জুগিয়েছে।

আজকের প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে মানুষ যত আধুনিক হচ্ছে, তত যেন মানবিকতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা ও বিভেদের ভাষা যখন ক্রমেই বাড়ছে, তখন রমেশ শীল আমাদের শেখান—মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় ধর্ম। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সংস্কৃতি শুধু বিনোদন নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় ও মানবিক চেতনার ভিত্তি।

আগামী ৯ মে এই কিংবদন্তি কবির ১৪৯তম জন্মবার্ষিকী। দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন এবং কবিকে স্মরণ করার লক্ষ্যে দিনব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে “কবিয়াল রমেশ স্মৃতি ট্রাস্ট”। অনুষ্ঠানে দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্ব, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য অতিথিবর্গ উপস্থিত থাকার সম্মতি জানিয়েছেন। দিনব্যাপী এ আয়োজনে থাকবে আলোচনা সভা, স্মৃতিচারণ, কবিগান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কবির সকল শুভানুধ্যায়ীদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য আন্তরিক আমন্ত্রণ জানিয়েছে কবিয়াল রমেশ পরিবার।

রমেশ শীল ছিলেন মাটির মানুষ, কিন্তু তাঁর চিন্তা ছিল মহাকালের। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—একজন সাধারণ মানুষও সত্য, সাহস ও মানবিকতা দিয়ে অসাধারণ হয়ে উঠতে পারেন। তাই রমেশ শীল কেবল অতীতের স্মৃতি নন; তিনি বর্তমানের প্রেরণা এবং ভবিষ্যতের দিশারী। তাঁর জন্মবার্ষিকী শুধু একজন কবিকে স্মরণ করার দিন নয়, বরং মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও ন্যায়ের পক্ষে নতুন করে শপথ নেওয়ারও একটি উপলক্ষ।

লেখক : মানস চৌধুরী,সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও কবিয়াল রমেশ শীল স্মৃতি ট্রাস্টের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি।