রবিবার গভীর রাতে চারদিকে নিস্তব্ধ পাহাড়…হঠাৎ থমকে যায় জঙ্গল সলিমপুর। অন্ধকার পাহাড়ে হঠাৎ শুরু হয় গুলির শব্দ। টার্গেট—সলিমপুরের আলীনগর স্কুলে থাকা র্যাব ও পুলিশের যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প।
র্যাবের দাবি—হামলায় ছিল ভয়ংকর ‘ইয়াসিন বাহিনী’। ২০০ থেকে ৩০০ জন সংঘবদ্ধ হয়ে এই হামলা চালায়! হাতে ছিল রামদা…দেশীয় অস্ত্র…এমনকি একে-৪৭-এর মতো ভয়ংকর আগ্নেয়াস্ত্রও!
জানা গেছে, রোববার দিবাগত রাত দুইটার দিকে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় অতর্কিত মুহুমুহু গুলি…চারদিকে আতঙ্ক…কাঁপতে থাকে আলীনগর এলাকা!
আত্মরক্ষায় পাল্টা গুলি ছোড়ে র্যাব। শুধু গুলি নয়…এক্সকাভেটর (খননযন্ত্র) দিয়ে নির্মাণাধীন নতুন একটি অস্থায়ী ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
সন্ত্রাসীদের আরও ভয়ংকর কৌশল—পুরো এলাকা বিচ্ছিন্ন করতে এক্সকেভেটর দিয়ে কেটে ফেলা হয় রাস্তা। কমপক্ষে তিন জায়গায় কেটে ফেলা হয় সড়ক ও কালভার্ট। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যাতায়াত ঠেকাতেই সন্ত্রাসী বাহিনীর এ কার্যক্রম।
তবু থামেনি অভিযান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম ও র্যাব-৭–এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে শুরু হয় সাড়াশি অভিযান! যোগ দেয় বিজিবিও। মধ্যরাত থেকেই পরদিন দুপুর পর্যন্ত চলে অভিযান।
রাতের আঁধারেই এগিয়ে যায় যৌথবাহিনী। গাড়ি থামিয়ে…পায়ে হেঁটে পৌঁছায় ঘটনাস্থলে! শটগান…চাইনিজ রাইফেল…গ্যাসগান—সব ব্যবহার করে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে যৌথ বাহিনী।
র্যাব-৭–এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ‘যাদের অভিযান চালিয়ে এখান থেকে তাড়ানো হয়েছিল, সেই সন্ত্রাসী ইয়াসিন গ্রুপের ২০০ থেকে ৩০০ জন লোক সংঘবদ্ধ হয়ে হামলা চালায়। তাদের হাতে রামদা, দেশীয় অস্ত্র এবং একে-৪৭-এর মতো আগ্নেয়াস্ত্র ছিল।’
তিনি জানান, হামলাকারীরা এক্সকাভেটর দিয়ে আলীনগর স্কুলে থাকা যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পের পেছনের দেয়াল ভেঙে দেয়। ওই স্কুলের শেষ প্রান্তে যৌথ বাহিনীর নতুন একটি অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি হচ্ছিল। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছিল। এক্সকাভেটর দিয়ে সেটি প্রায় পুরোটাই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা ফায়ার (গুলি) করে আমাদের লোকজনকে ব্যস্ত রাখে এবং সেই সুযোগে ভাঙচুর চালায়। ক্যাম্পের পাশের পাহাড়ে থাকা নতুন কয়েকটি টিনের ঘরের ভেতর থেকে টিন ফুটো করে বন্দুকের নল বের করে তারা গুলি ছুড়েছে।
আমাদের লোকজন মানবাধিকার সমুন্নত রেখে পাল্টা গুলি চালিয়েছে। এই ঘটনায় আমাদের কেউ হতাহত হয়নি।’
তবে তিনি দাবি করেছেন “মানবাধিকার সমুন্নত রেখে পাল্টা গুলি চালানো হয়েছে।”
জানা গেছে, মাত্র কিছুদিন আগেই আলীনগর স্কুলে থাকা যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পের ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছিল। গতকাল মধ্যরাতেই তা পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। এক্সকাভেটর দিয়ে ভেঙে ফেলা হয় ক্যাম্পের পেছনের দেয়াল। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় নতুন নির্মাণাধীন অস্থায়ী ক্যাম্পটি।
পুলিশের দাবি—মোট ১০৪ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়েছে। পাহাড়ের টিনের ঘরের ভেতর লুকিয়ে টিন ফুটো করে বের করা হয় বন্দুকের নল। সেখান থেকেই চলে এলোপাতাড়ি গুলি!
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এসপি মাসুদ আলম বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে যাতায়াতের রাস্তার বেশ কয়েকটি অংশ এক্সকাভেটর দিয়ে কেটে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে, যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো যানবাহন ব্যবহার করতে না পারে এবং দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারে।
তিনি বলেন, ‘আলীনগর স্কুলে র্যাব, পুলিশ, এপিবিএন ও আরআরএফ সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। সন্ত্রাসীদের উদ্দেশ্য ছিল, আমাদের ফোর্স যেন সেখান থেকে বের হতে না পারে।’
এসপি আরও বলেন, আমাদের ফোর্স শটগান, চাইনিজ রাইফেল ও গ্যাসগান ব্যবহার করেছেন। পুলিশের পক্ষ থেকে মোট ১০৪টি গুলি ছোড়া হয়েছে। শক্ত প্রতিরোধের কারণে সন্ত্রাসীরা ক্যাম্পের ভেতর ঢুকতে পারেনি।
অভিযানে আটক হয়েছেন কয়েকজন। তবে পাহাড়ি অন্ধকারে পালিয়েছে আরও অনেকে! এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে ইয়াসিন, রোকন উদ্দিন, মশিউর রহমান, নুরুল হক ভান্ডারি, গাজী সাদেক ও গোলাম গফুরসহ শীর্ষ সন্ত্রাসীরা।
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক ধরে এগোলে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিপরীত দিকে একটি সড়ক ঢুকে গেছে পাহাড়ের ভেতরে। সেই পথেই শুরু সলিমপুর। জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর, মূলত দুটি অংশে বিভক্ত এলাকাটি।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এখানে ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বিভিন্ন ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী।
বিভিন্ন সময় চেষ্টা করেও এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব হয়নি। উল্টো অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
প্রথমবারের মতো গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্য যৌথ অভিযান চালিয়ে এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেন।
যৌথ অভিযানে ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিন, রোকন বাহিনীর প্রধান রোকন উদ্দিন; মশিউর রহমান, নুরুল হক ভান্ডারি, গাজী সাদেক, গোলাম গফুরসহ কয়েকজন ‘সন্ত্রাসী’ পলাতক ছিলেন।
তারাই ফের সংঘবদ্ধ হয়ে গভীর রাতে র্যাব ও পুলিশের যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালায়।
তবে বর্তমানে পুরো জঙ্গল সলিমপুর এলাকা যৌথ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জানিয়ে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এসপি মাসুদ আলম বলেন, সেখানে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু আসামিকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



