back to top

মৃত্যুতেও বিচ্ছেদ নয়, শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত জড়িয়ে ছিলেন দুজন!

শেষ আশ্রয়, শেষ আলিঙ্গন এবং এক হোটেল ট্র্যাজেডির নির্মম শিক্ষা

প্রকাশিত: ০৬ জুন, ২০২৬ ১১:৪৮

দরজাটি ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। বাইরে তখন কালো ধোঁয়ার দাপট, আতঙ্কিত মানুষের চিৎকার, দৌড়ঝাঁপ আর মৃত্যুর সঙ্গে সময়ের প্রতিযোগিতা।

আর ভেতরে ছিল এক ভয়ংকর নীরবতা। এমন নীরবতা, যা কোনো শব্দে ব্যাখ্যা করা যায় না।

দিল্লির মালবীয় নগরের ‘ফ্লারিশ স্টে বিএনবি’ হোটেলে বুধবার (৩ জুন) সকালের সেই অগ্নিকাণ্ডে ২১ জন মানুষের জীবন থেমে যায়।

নিহতদের মধ্যে ছিলেন ১২ জন বিদেশি নাগরিকও। কিন্তু অসংখ্য মৃত্যুর ভিড়ে যে দৃশ্যটি উদ্ধারকারীদের হৃদয়ে গভীর ক্ষত এঁকে দিয়েছে, সেটি ছিল এক দম্পতির শেষ মুহূর্তের গল্প।

যখন উদ্ধারকারীরা নিচতলার একটি বাথরুমের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন, তখনও তারা একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ছিলেন।

নারীটি বসেছিলেন টয়লেট সিটে। পাশে একটি চেয়ারে বসা পুরুষটি তাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ছিলেন। নারীর মাথা ছিল তার কাঁধে। যেন মৃত্যুর আগমুহূর্তেও দুজন দুজনকে সাহস দিচ্ছিলেন।

মোহাম্মদ শোয়েব, যিনি উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন, পরে জানান—তারা আগুনে পুড়ে মারা যাননি। ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে তাদের।

সম্ভবত কক্ষজুড়ে ধোঁয়া ঢুকে পড়ার পর বাঁচার শেষ চেষ্টা হিসেবে তারা বাথরুমে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

হয়তো ভেবেছিলেন, কিছুক্ষণ পর উদ্ধারকর্মীরা আসবে। হয়তো ভেবেছিলেন, এই বিপদও কেটে যাবে। কিন্তু ধোঁয়া তাদের জন্য কোনো সময় রাখেনি।

উদ্ধারকারীরা জানান, তাদের শরীর কালচে হয়ে গিয়েছিল। তবুও শেষ চেষ্টা হিসেবে সিপিআর দেওয়া হয়।

শোয়েবের কণ্ঠে তখনও সেই দৃশ্যের ভার। “আমি এক মিনিট বাইরে এসে সাহস জোগাড় করি। তারপর আবার ঢুকে চেষ্টা করি। কিন্তু আর কিছুই করার ছিল না।”

কিছু দৃশ্য পেশাদার উদ্ধারকারীকেও ভেঙে দেয়। কারণ সেখানে শুধু মৃত্যু থাকে না, থাকে মানুষের অসহায়ত্ব, ভালোবাসা এবং বেঁচে থাকার শেষ আকুতি।

কিন্তু ওই দম্পতিই ছিলেন না একমাত্র ট্র্যাজেডির সাক্ষী। একই ভবনের আরেকটি কক্ষে বিছানার কিনারায় বসা অবস্থায় আরেক দম্পতির দগ্ধ মরদেহ পাওয়া যায়।

মনে হয়েছিল, তারা হয়তো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বের হওয়ার পথ খুঁজছিলেন। হয়তো অপেক্ষা করছিলেন কেউ এসে দরজা খুলে দেবে। কিন্তু অপেক্ষার আগেই মৃত্যু পৌঁছে যায়।

ম্যাক্স হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মী আশরাফ খান বলেন, ভেতরের দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

রিসেপশনের কাছে পড়ে ছিল এক তরুণীর সম্পূর্ণ দগ্ধ দেহ। একটু দূরে হুইলচেয়ারে বসা এক ব্যক্তির পোড়া দেহ।

কয়েকজন বিদেশি নাগরিককে অচেতন অবস্থায় বের করে সিপিআর দেওয়া হয়। ধোঁয়া আর আগুনের সেই বিভীষিকার মধ্যে জীবন আর মৃত্যুর সীমারেখা বারবার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল।

উদ্ধারকারীরা বেজমেন্ট দিয়ে প্রবেশ করতে বাধ্য হন। শাটার কেটে তারা ভবনের ভেতরে ঢোকেন।

ধোঁয়ায় ঢাকা অন্ধকার করিডোরে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই তারা একের পর এক মানুষকে কাঁধে, চাদরে, হাতে তুলে বাইরে নিয়ে আসেন।

দ্বিতীয় তলায় পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা স্মরণ করতে গিয়ে আশরাফ খান বলেন, “মনে হচ্ছিল আমরা নিজেরাই বাঁচব না।”

এই একটি বাক্যই হয়তো পুরো পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝিয়ে দেয়।

ভবনের বাইরে তখন আরেক যুদ্ধ চলছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা জানালা ভেঙে আটকে পড়াদের নিচে লাফ দিতে বলছিলেন। জীবন বাঁচানোর তাগিদে মানুষ তখন যেকোনো পথ খুঁজছিল।

সেই মুহূর্তে মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠেন রিয়াজউদ্দিন মানসুরি ও তার ছেলে আরমান। তারা ভবনের নিচে ২০ থেকে ২২টি ম্যাট্রেস বিছিয়ে দেন, যাতে লাফিয়ে পড়লে মানুষের আঘাত কম লাগে।

এই কাজে তাদের প্রায় দুই লাখ রুপির ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু তার উত্তর ছিল অত্যন্ত সরল—“পুরো বিষয়টি মানবিকতার জায়গা থেকে করেছি।”

মৃত্যুর ভিড়ে এই ধরনের মানুষরাই মনে করিয়ে দেন, বিপর্যয়ের মধ্যেও মানবতা বেঁচে থাকে।

একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গেছে, এক বিদেশি নাগরিক ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে একটি খুঁটি আঁকড়ে নিচে নামার পথ খুঁজছেন।

চারদিকে ঘন কালো ধোঁয়া। চোখেমুখে আতঙ্ক। সেই ভিডিও আসলে শুধু একজন মানুষের নয়; এটি ছিল সেদিন আটকে পড়া অসংখ্য মানুষের অসহায়তার প্রতিচ্ছবি।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে ভবনের বেজমেন্টে আগুনের সূত্রপাত হয়।

শর্ট সার্কিটকে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ১৭টি টেন্ডার কাজ করে। অন্তত ৫৮ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

কিন্তু তদন্তের প্রাথমিক তথ্য আরও উদ্বেগজনক বাস্তবতা সামনে এনেছে। পুলিশ জানিয়েছে, বহুতল ভবনটিতে ছিল মাত্র একটি প্রবেশ ও নির্গমন পথ। হোটেলটির কোনো অগ্নিনিরাপত্তা সনদ (এনওসি) ছিল না।

মাত্র ছয়টি কক্ষের অনুমোদন নিয়ে অবৈধভাবে পরিচালনা করা হচ্ছিল ২৫টি কক্ষ। বাতাস চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় জানালাগুলোও সিল করা ছিল।

অর্থাৎ, মানুষ শুধু আগুনের সঙ্গে লড়েনি; লড়েছে অব্যবস্থাপনা, অবহেলা এবং নিয়মভঙ্গের দীর্ঘ ছায়ার সঙ্গেও।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক প্রশ্নটি এখানেই—যদি পর্যাপ্ত নির্গমন পথ থাকত, যদি অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর থাকত, যদি জানালাগুলো খোলা থাকত, তাহলে কি সেই বাথরুমে আশ্রয় নেওয়া দম্পতিটি আজও বেঁচে থাকতেন?

হয়তো উত্তরটি আর কোনো দিন জানা যাবে না।

এদিকে পুলিশ হোটেল মালিক লাভকেশ বাজাজকে গ্রেপ্তার করেছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্বীকার করেছেন, আগুন লাগার পর আতঙ্কে তিনি জ্বলন্ত ভবনের সামনে দিয়েই নিজের গাড়ি চালিয়ে পালিয়ে যান।

কিন্তু যেসব মানুষ আর ফিরলেন না, তাদের পরিবারের কাছে এই স্বীকারোক্তি কোনো সান্ত্বনা নয়।

আজ মালবীয় নগরের সেই হোটেল ভবনে হয়তো আগুন নেই, ধোঁয়াও নেই। কিন্তু সেখানে রয়ে গেছে কিছু শেষ মুহূর্তের গল্প—একটি বাথরুমে আশ্রয় নেওয়া দুই মানুষের গল্প, যারা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একে অপরকে ছাড়েননি।

রয়ে গেছে সেই প্রশ্নও—মানুষ কি সত্যিই আগুনে মারা যায়, নাকি কখনও কখনও অবহেলাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে ভয়ংকর অগ্নিশিখা? আর রয়ে গেছে একটি দৃশ্য, যা উদ্ধারকারীদের স্মৃতিতে বহুদিন তাড়া করে ফিরবে—

দুটি নিথর দেহ, একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে আছে; যেন মৃত্যুকেও জানিয়ে দিচ্ছে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা একা ছিলেন না।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি