চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে শুরু হয়েছে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ উন্নয়ন কার্যক্রম।
বুধবার সকাল ৯টায় উদ্বোধন হওয়া এ কর্মসূচির মাধ্যমে হাসপাতালটিকে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও চমেক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন।
চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল চমেক প্রতিদিন হাজারো রোগী ও স্বজনের ভরসাস্থল। দীর্ঘদিন ধরে পরিচ্ছন্নতা সংকট, ফুটপাত দখল, অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ায় অনিয়ম, দালালচক্রের তৎপরতা ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা অভিযোগ ছিল।
নতুন এই উদ্যোগকে তাই অনেকেই হাসপাতালের পরিবেশ ও সেবার মানোন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
পরিচ্ছন্নতার মধ্য দিয়ে পরিবর্তনের সূচনা:
উদ্বোধনের পর মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন হাসপাতাল এলাকার বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখেন এবং প্রতিটি দোকানে ডাস্টবিন সংরক্ষণ ও সঠিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নির্দেশ দেন।
একই সঙ্গে হাসপাতাল চত্বরের নালা-নর্দমায় মশার লার্ভা নিধনের ওষুধ ছিটানো হয়।
তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে আমরা একটি পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও মানবিক হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।
এখানে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। দীর্ঘদিনের অরাজকতা ও অনিয়মের অবসান ঘটিয়ে জনগণের জন্য একটি সেবাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।”
২০ জনের স্থায়ী পরিচ্ছন্নতা টিম:
পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে এককালীন উদ্যোগে সীমাবদ্ধ না রেখে স্থায়ী রূপ দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান মেয়র।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন থেকে ১০ জন এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ১০ জনসহ মোট ২০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন।
এতে হাসপাতালের করিডর, বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ ও আশপাশের এলাকা নিয়মিত পরিষ্কার রাখা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ফুটপাত হবে নিরাপদ পথচারী জোন:
হাসপাতাল এলাকায় অবৈধ দখল ও ভাসমান ব্যবসা বন্ধের ঘোষণা দিয়ে মেয়র বলেন, ওয়ালি বেগ খাঁ মসজিদ থেকে মেডিকেল স্টাফ কোয়ার্টার পর্যন্ত পুরো ফুটপাতকে একটি নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন পথচারী জোনে পরিণত করা হবে।
তিনি স্পষ্ট করে জানান, “এখানে কোনো ধরনের ভাসমান ব্যবসায়ী, ফল বা ডাব বিক্রেতা এবং ট্রলি ব্যবসা করতে পারবে না।
এলাকাটি সৌন্দর্যবর্ধনের আওতায় এনে সবুজায়ন ও গ্রাফিতির মাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ফুটপাত দখলমুক্ত হলে রোগী ও স্বজনদের চলাচল সহজ হবে এবং যানজটও কমবে।
অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ায় নৈরাজ্য বন্ধের উদ্যোগ:
চমেক হাসপাতাল এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগের কথাও তুলে ধরেন মেয়র।
তিনি জানান, অতীতে রোগীদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ পরিস্থিতি বন্ধে নির্দিষ্ট ভাড়ার তালিকা বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন তিনি।
মেয়রের ভাষায়, “এ ধরনের নৈরাজ্য আর চলবে না।” এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের আর্থিক চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ধূমপানমুক্ত ও মাদকমুক্ত হাসপাতাল:
চমেক হাসপাতাল চত্বরকে ধূমপানমুক্ত ও মাদকমুক্ত এলাকা ঘোষণার পরিকল্পনার কথাও জানান ডা. শাহাদাত হোসেন।
তিনি বলেন, “এটি একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। এখানে ধূমপান বা মাদকসেবনের কোনো সুযোগ থাকবে না। খুব দ্রুত এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে।”
স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এমন পরিবেশ নিশ্চিত হলে রোগীদের সুস্থতার জন্য ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে চিকিৎসকরা মনে করছেন।
দালালচক্র ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘শুদ্ধি অভিযান’:
হাসপাতালের অভ্যন্তরে দালালচক্র, রোগী ভাগিয়ে নেওয়া সিন্ডিকেট এবং ওষুধ ব্যবসায়ীদের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়ে মেয়র বলেন,“আমরা একটি শুদ্ধি অভিযানে নেমেছি।
দালালচক্র, রোগী হয়রানি এবং অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রোগীরা যেন নিরাপদে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে চিকিৎসাসেবা পায়, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।”
চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, হাসপাতাল চত্বরে কিছু অসাধু চক্র রোগীদের বিভ্রান্ত করে বাইরে নিয়ে যায় এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে। নতুন উদ্যোগে এসব অনিয়ম কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পানি সংকট নিরসনেও উদ্যোগ:
হাসপাতালের পানি সংকট নিরসনে নতুন গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানান মেয়র। এতে রোগী, স্বজন ও হাসপাতাল কর্মীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমবে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, হাসপাতালের আশপাশের বাসিন্দা ও নিয়মিত সেবাগ্রহণকারীরা বলছেন, চমেকের পরিবেশ উন্নত হলে শুধু রোগীরাই নয়, পুরো এলাকাই উপকৃত হবে।
পরিচ্ছন্নতা, যানজট কমা, ফুটপাত মুক্ত হওয়া এবং নিরাপদ পরিবেশ—সব মিলিয়ে হাসপাতালকেন্দ্রিক নগরজীবনের মান উন্নত হবে।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিনসহ চসিক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
চট্টগ্রামের মানুষের জন্য চমেক শুধু একটি হাসপাতাল নয়, বরং আস্থার প্রতীক। পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক সেবার এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে হাসপাতালটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে—এমনটাই প্রত্যাশা রোগী, চিকিৎসক ও নগরবাসীর।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

