চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কথিত সভা ও মশাল মিছিল ঘিরে দায়ের হওয়া মামলা শুধু একটি আইনশৃঙ্খলাজনিত ঘটনা নয়।
বরং এটি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও পুরোনো সাংগঠনিক কাঠামোর অস্তিত্ব ও সক্রিয়তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
পুলিশের দায়ের করা মামলায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম, চট্টগ্রাম-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য খাদিজাতুল আনোয়ার এবং চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিমসহ ২৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।
একই সঙ্গে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৮০ থেকে ৯০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার হওয়া মো. জামান বাবু ও সাইফুল ইসলামের নামও মামলার এজাহারে রয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ফটিকছড়ির রোসাঙ্গিরি এলাকায়। অভিযোগ অনুযায়ী, উপজেলার একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্রামাগারে শতাধিক নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
পরে সেই সভার একাধিক ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর পরপরই বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে আসে।
প্রশ্ন হচ্ছে, নিষিদ্ধ ঘোষণার পরও কীভাবে একটি সংগঠনের এতসংখ্যক নেতাকর্মী একই স্থানে সমবেত হওয়ার সাহস ও সক্ষমতা অর্জন করল?
এখানেই ঘটনার রাজনৈতিক গুরুত্ব নিহিত। কারণ কোনো সংগঠনকে প্রশাসনিক বা আইনি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা গেলেও তার সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক, স্থানীয় প্রভাব কিংবা কর্মীসংযোগ রাতারাতি বিলীন হয়ে যায় না। ফটিকছড়ির ঘটনাটি যেন সেই বাস্তবতারই একটি প্রতিফলন।
পুলিশের এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, নাজিরহাট–মাইজভাণ্ডার সড়কে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মশাল হাতে মিছিল বের করেছিলেন।
পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তাঁরা পালানোর চেষ্টা করেন। পরে ধাওয়া দিয়ে দুজনকে আটক করা হয় এবং ঘটনাস্থল থেকে চারটি বাঁশের তৈরি মশাল জব্দ করা হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মশাল মিছিল বরাবরই প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। এটি কেবল একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি নয়; বরং সংগঠনের উপস্থিতি জানান দেওয়া, সমর্থকদের মনোবল প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার একটি বহুল ব্যবহৃত মাধ্যম।
ফলে ফটিকছড়ির মশাল মিছিলকে সাধারণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মামলার এজাহারে সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম ও সাবেক সংসদ সদস্য খাদিজাতুল আনোয়ারের নাম উঠে আসা।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পুলিশ বলছে, তাঁদের নির্দেশনায় লোকজন জড়ো হয়েছিল।
তবে আইনগতভাবে অভিযোগ আর অপরাধ এক বিষয় নয়। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে দোষী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোও সেই নিশ্চয়তাই দেয়। ফলে এখন নজর থাকবে তদন্ত সংস্থার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং আদালতের পর্যবেক্ষণের দিকে।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করা, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং ষড়যন্ত্রমূলক কার্যক্রমের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় মামলা হওয়ায় বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত ভিত্তি নির্ধারিত হবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
ফটিকছড়ির এই ঘটনা মূলত তিনটি বড় বাস্তবতা সামনে এনেছে।
প্রথমত, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা গেলেও মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক কাঠামো কতটা কার্যকরভাবে নিষ্ক্রিয় করা গেছে, সেই প্রশ্ন এখন আলোচনায়।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে পুরোনো রাজনৈতিক নেটওয়ার্কগুলোর প্রভাব ও যোগাযোগ এখনও কতটা বিদ্যমান, তা নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।
তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম আর গোপন রাখা সহজ নয়। যে সভা হয়তো সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেটির ছবিই শেষ পর্যন্ত পুরো ঘটনাকে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
ফটিকছড়ির মামলার তদন্ত শেষ হতে সময় লাগবে। আদালতের রায়ও আসবে নিজস্ব গতিতে।
কিন্তু এরই মধ্যে ঘটনাটি একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—নিষিদ্ধ ঘোষণা কোনো সংগঠনের আনুষ্ঠানিক পরিচয়কে সীমাবদ্ধ করতে পারে, কিন্তু তার সাংগঠনিক শিকড় কতটা উপড়ে ফেলা গেছে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
আর সেই কারণেই ফটিকছড়ির ঘটনা কেবল একটি মামলার খবর নয়; এটি বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, সাংগঠনিক শক্তির পুনর্বিন্যাস এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা নিয়ে নতুন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

