back to top

দুপুরের ব্যস্ত বাজারে ঢুকে গুলি, মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়লেন যুবদলকর্মী মাসুদুল!

উত্তাল চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়ক, ক্ষোভে ফুঁসছে এলাকা

প্রকাশিত: ১৩ জুন, ২০২৬ ১০:২৩

দুপুর তখন গড়িয়েছে। চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে ছিল স্বাভাবিক দিনের ব্যস্ততা।

কেউ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনছেন, কেউ দোকানের সামনে আড্ডায় মগ্ন। ঠিক সেই সময় হঠাৎ কয়েকটি গুলির শব্দ ছিন্নভিন্ন করে দেয় বাজারের স্বাভাবিক ছন্দ।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন ব্যক্তি অতর্কিতে এসে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে মাসুদুল হক চৌধুরীর দিকে। মুহূর্তের মধ্যেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। আতঙ্কে চারদিকে ছোটাছুটি শুরু হয়।

দোকানের শাটার নামতে থাকে, পথচারীরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দৌড়াতে থাকেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ব্যস্ত বাজার পরিণত হয় এক আতঙ্কগ্রস্ত জনপদে।

নিহত মাসুদুল হক চৌধুরী রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বেতাগী এলাকার সাদেক চৌধুরীর ছেলে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

ওষুধ কিনতে গিয়েই মৃত্যুর মুখে:
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মাসুদুল ওষুধ কিনতে চৌমুহনী বাজারে গিয়েছিলেন। এমন একটি ব্যক্তিগত ও সাধারণ প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে যে তিনি প্রাণ হারাবেন, তা হয়তো কল্পনাও করেননি।

রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, কয়েকজন ব্যক্তি এসে তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়। ঘটনার পরপরই হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে হামলার ধরন।

অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, ব্যস্ত বাজারের মধ্যে দিনের আলোয় এমন হামলা কি কেবল আকস্মিক ঘটনা, নাকি পরিকল্পিত লক্ষ্যবস্তু হত্যাকাণ্ড? যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

মরদেহ ঘিরে ক্ষোভ, উত্তপ্ত জনপদ:
এদিকে গুলির ঘটনার পর দীর্ঘ সময় ঘটনাস্থলে পড়ে ছিল মাসুদুলের মরদেহ। স্থানীয়দের দাবি, তার মাথায় গুলি করা হয়েছে। রক্তাক্ত সেই দৃশ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে। বাজারে ভিড় বাড়তে থাকে, সঙ্গে বাড়তে থাকে ক্ষোভও।

একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ মানুষ চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কে অবস্থান নেন। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক এবং ছোট যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। ঘটনাস্থলজুড়ে তখন এক ধরনের থমথমে পরিবেশ।

স্থানীয়দের অনেকের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় সহিংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি জনমনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। ফলে এই হত্যাকাণ্ড নতুন করে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে।

ঘটনাস্থলে পুলিশ-র‍্যাব:
খবর পেয়ে পুলিশ ও র‍্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (রাঙ্গুনিয়া সার্কেল) মো. বেলায়েত হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “গুলির ঘটনা শুনে এসে একজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পেয়েছি। কারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।”

পুলিশের একাধিক দল ঘটনাস্থল থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে। আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে।

হামলার পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কিংবা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

রাউজানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায়:
চৌমুহনী বাজারের এই হত্যাকাণ্ডটি আবারও রাউজানের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

গত দুই বছরে উপজেলাটিতে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। প্রায় প্রতিটি ঘটনার পরই দ্রুত বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে।

শনিবারের এই রক্তাক্ত ঘটনাও সেই উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে। দিনের আলোয় জনসমাগমপূর্ণ একটি বাজারে সংঘটিত এই হামলা সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—কতটা নিরাপদ জনবহুল বাজার, আর কতটা নিরাপদ সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা?

এ প্রশ্নের উত্তর এখন খুঁজছে পুরো এলাকা। আর তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মাসুদুল হত্যাকাণ্ড ঘিরে নানা আলোচনা, জল্পনা ও উদ্বেগ চলতেই থাকবে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি