‘তুই আসামি, চুপ থাক’-ক্রিকেটারকে ‘চোরাকারবারি’ ভেবে পেটাল পুলিশ!

বরখাস্ত এসআই-কনস্টেবল, তদন্তে প্রশ্নের পাহাড়: বেরোচ্ছে চাঞ্চল্যকর তথ্য

প্রকাশিত: ১৩ জুন, ২০২৬ ১৫:০১

শুক্রবার রাত। ঢাকার ব্যস্ত ক্রিকেট মৌসুম শেষে নিজের শহর চট্টগ্রামে ফিরছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের স্পিনার নাঈম হাসান।

বিমানবন্দর থেকে বাসায় ফেরার পথটা হওয়ার কথা ছিল আর দশটা দিনের মতোই স্বাভাবিক। কিন্তু কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সেই যাত্রা পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে।

লালখান বাজার এলাকায় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা থামানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় পুরো ঘটনা।

এরপর যা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তা শুধু একজন জাতীয় ক্রিকেটারের জন্য নয়, সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আচরণ নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

নাঈম হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে গাড়ি থেকে নামিয়ে গলায় ধাক্কা দেওয়া হয়। জাতীয় দলের ক্রিকেটার পরিচয় দেওয়ার পরও থামেনি হয়রানি। বরং শুনতে হয়েছে, “তুই আসামি, চুপ থাক, একটা কথাও বলবি না।” এরপর শুরু হয় মারধর।

জানা গেছে, নাঈম হাসানের ফ্লাইট নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে চট্টগ্রামে পৌঁছায়। রাত প্রায় সাড়ে ১০টার দিকে বিমানবন্দর থেকে অটোরিকশায় বাসার উদ্দেশে রওনা হন তিনি।

এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নামার পর লালখান বাজার এলাকায় পুলিশের এক সদস্য অটোরিকশাটি থামান। কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে চালকের কাগজপত্র জব্দ করেন।

প্রথমে বিষয়টি সাধারণ তল্লাশি বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পরিস্থিতি পাল্টে যায়।

নাঈমের অভিযোগ, তাঁকে জোর করে নামিয়ে পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। তিনি পরিচয়পত্র দেখিয়ে জাতীয় দলের ক্রিকেটার বলে জানালেও অভিযানে থাকা এসআই শফিকুল ইসলাম লাঠি দিয়ে আঘাত করেন।

অভিযোগ রয়েছে, অভিযানে থাকা পুলিশের সোর্স সোহেলও পাইপ দিয়ে তাঁকে মারধরে অংশ নেন। ঘটনার সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশ হিসেবে দাবি করে নাঈম বলেন, ঘটনাস্থলে দ্রুত ১০০ থেকে ২০০ মানুষ জড়ো হয়। উপস্থিত অনেকেই তাঁকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে চিহ্নিত করেন।

কিন্তু সেই পরিচয়ও পরিস্থিতি বদলাতে পারেনি। বরং তাঁকে বারবার ‘আসামি’ বলে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়।

এই অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্ন ওঠে—পরিচয় যাচাইয়ের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন বলপ্রয়োগ অব্যাহত ছিল? কেন একজন ব্যক্তিকে সন্দেহভাজন মনে করেই শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠল? পুলিশের গাড়ি ছিল, তবুও অন্য অটোরিকশায় তোলার চেষ্টা কেন?

পুরো ঘটনার সবচেয়ে রহস্যজনক অংশগুলোর একটি এটি।

নাঈমের অভিযোগ, ঘটনাস্থলে পুলিশের গাড়ি উপস্থিত ছিল। কিন্তু তাঁকে সেই গাড়িতে না তুলে অন্য একটি অটোরিকশায় করে অজ্ঞাত স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। একজন সন্দেহভাজনকে আটকের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্ধারিত প্রক্রিয়া রয়েছে।

তাহলে কেন ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল? এই প্রশ্ন এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

মারধরের অভিযোগের পর নাঈমকে খুলশী থানায় নেওয়া হয়। সেখানে ওসির কক্ষেও তিনি হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন।

নাঈমের দাবি, ঘটনার বর্ণনা দিতে গেলে ওসি তাঁকে বারবার চোখ নিচু করে কথা বলতে বলেন। তবে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে একটি ফোনকলের পর।

থানায় নিজের ফোন ফিরে পেয়ে নাঈম বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি তামিম ইকবালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর বিসিবির পক্ষ থেকে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনা হয়।

তদন্তে বেরিয়ে আসছে ‘সোনার চালান’ সূত্র:
পুলিশ সূত্রে পাওয়া তথ্যে ঘটনাটির পেছনে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলছে। জানা গেছে, ছুটিতে থাকা খুলশী থানার এসআই মনিরুল ইসলাম একটি তথ্য দেন—একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় সোনার চোরাচালান আসবে।

এই তথ্যের ভিত্তিতে এসআই শফিকুল ইসলাম অভিযান পরিচালনা করেন। মনিরুল দাবি করেছেন, তিনি একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে তথ্য পেয়েছিলেন।

কিন্তু সেই তথ্য কতটা যাচাই করা হয়েছিল? তথ্যটি কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল? আর যাচাই-বাছাই ছাড়াই কেন অভিযানে নামা হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্ত কমিটি।

এদিকে ঘটনার পর খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমানের বক্তব্য নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, এসআই শফিকুল ইসলাম তাঁকে অভিযানের বিষয়ে আগে কিছু জানাননি।

অর্থাৎ থানার প্রধান কর্মকর্তার অজান্তেই এমন একটি অভিযান পরিচালিত হয়েছিল বলে দাবি উঠেছে। যদি তা সত্য হয়, তাহলে অভিযানের অনুমোদন, সমন্বয় এবং জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

মামলা, বরখাস্ত, আটক:
ঘটনার পর শনিবার সকালে নাঈমের ভাই সাব্বির আলম মারধর ও অপহরণচেষ্টার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেন। মামলায় আসামি করা হয়েছে—এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল মো. রাসেল চৌধুরী ও পুলিশের সোর্স সোহেলকে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ইতোমধ্যে এসআই শফিকুল ইসলাম ও কনস্টেবল রাসেল চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পুলিশের সোর্স সোহেলকেও আটক করা হয়েছে।

ক্রিকেটাঙ্গনের ক্ষোভ:
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ক্রিকেট অঙ্গনে। মুশফিকুর রহিম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ঘটনাটি তাঁকে ব্যথিত ও লজ্জিত করেছে। তাসকিন আহমেদ একে ‘ন্যক্কারজনক’ আখ্যা দিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন। লিটন দাস বলেন, বাংলাদেশের কোনো নাগরিকই এমন আচরণের শিকার হওয়ার যোগ্য নয়।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব) পৃথক বিবৃতিতে ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে।

এদিকে ভাইরাল হওয়া ঘটনাটির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন নাঈম না হলে কী হতো?

নাঈম হাসান জাতীয় দলের ক্রিকেটার। তাঁর পরিচয় আছে, জনপ্রিয়তা আছে, বিসিবি আছে, সতীর্থরা আছেন, সংবাদমাধ্যম আছে।

তাঁর জন্য মধ্যরাতে থানায় মানুষ ছুটে গেছে। কিন্তু একজন সাধারণ নাগরিক হলে? তাঁর জন্য কি এত দ্রুত তদন্ত কমিটি হতো? বরখাস্ত হতেন অভিযুক্তরা? দেশজুড়ে এত আলোচনা হতো?

এই প্রশ্নগুলো এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের টেবিল পর্যন্ত আলোচনায়। তদন্তের দিকে তাকিয়ে চট্টগ্রাম

অপরদিকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী ইতোমধ্যে নাঈম হাসানের বাসায় গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেছেন, জড়িতদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। কিন্তু জনমতের আদালত এখনো সন্তুষ্ট নয়।

কারণ, এই ঘটনা কেবল একজন ক্রিকেটারকে মারধরের অভিযোগ নয়। এটি ক্ষমতার ব্যবহার, মাঠপর্যায়ের পুলিশি আচরণ, সোর্সনির্ভর অভিযানের ঝুঁকি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা-সবকিছুকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

তদন্ত শেষ হতে সময় লাগতে পারে। কিন্তু লালখান বাজারের সেই রাত ইতোমধ্যে একটি প্রশ্ন স্থায়ীভাবে ছুঁড়ে দিয়েছে-একজন জাতীয় ক্রিকেটার যদি নিজেকে পরিচয় দিয়েও রেহাই না পান, তাহলে সাধারণ নাগরিক কতটা নিরাপদ?

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি