সারের সংকটে খাদ্যঝুঁকিতে দেশের পৌনে দুই কোটি মানুষ: জাতিসংঘ

প্রকাশিত: ২৩ জুলাই, ২০২৬ ১৪:৫৮

হাজার হাজার মাইল দূরে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত মরুভূমি আর লোহিত সাগরের নীল জলরাশি। সেখানে যখন যুদ্ধের দামামা বাজে, আর আকাশে ওঠে বারুদের ধোঁয়া, তখন আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে তা বুঝি অনেক দূরের গল্প।

কিন্তু বিশ্বায়নের এই যুগে সেই যুদ্ধের আঁচ কতটা নির্মমভাবে এসে লাগতে পারে বাংলার দিগন্তজোড়া সবুজ ধানের ক্ষেতে-তারই এক ভয়ংকর পূর্বাভাস দিল জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)।

হরমুজ প্রণালির সামরিক অচলাবস্থা আর বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের হু-হু করে দাম বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে সার সরবরাহে তৈরি হতে পারে অভূতপূর্ব সংকট।

আর এই সার সংকট শেষ পর্যন্ত দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে এক বিশাল ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে তীব্র সতর্কতা জারি করেছে সংস্থাটি।

অক্টোবর পার হলেই কি ঘনিয়ে আসবে অন্ধকার?

ডব্লিউএফপির সাম্প্রতিক এক উদ্বেগজনক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে কৃষিকাজে ব্যবহৃত মোট ইউরিয়া সারের প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানি করা হয় মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশ-সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে।

কিন্তু ভূ-রাজনীতি ও যুদ্ধের উত্তাপে সেই আমদানির পথ আজ প্রায় রুদ্ধ।

প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ ইউরিয়া সার মজুত রয়েছে, তা দিয়ে আগামী অক্টোবর পর্যন্ত চাহিদা মেটানো সম্ভব।

কিন্তু যুদ্ধ যদি না থামে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হয়, তবে অক্টোবরের পর কী হবে-তা নিয়ে গভীর চিন্তার ভাঁজ পড়েছে বিশেষজ্ঞদের কপালে।

ডব্লিউএফপির আশঙ্কা, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

একদিকে চড়া বাজার, অন্যদিকে ঘরের কারখানায় তালা

বিশ্ববাজারে ইউরিয়ার দাম ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একদিকে আমদানির চড়া মূল্য, অন্যদিকে দেশের ভেতরের চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়।

দেশে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি ইউরিয়া কারখানার মধ্যে তিনটিরই উৎপাদন এখন পুরোপুরি বন্ধ। ফলে দেশীয় উৎস থেকেও ঘাটতি পূরণের আশা আপাতত ক্ষীণ।

বহিরাগত যুদ্ধের ধাক্কা আর অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সংকটের এই যৌথ কামড় ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

এই সংকটের বিষাক্ত শিকড় গেঁথে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে। ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘আনসার আল্লাহ’ (হুথি) সম্প্রতি লোহিত সাগরে তাদের সামুদ্রিক অবরোধ অমান্য করার অভিযোগে সৌদি আরবগামী দুটি তেলবাহী জাহাজে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে গোষ্ঠীটি জানায়, লোহিত সাগরে তাদের আরোপিত অবরোধ অমান্য করায় এনসেলিয়া (ENCELIA) ও লায়লা (LAYLA) নামের জাহাজ দুটিকে লক্ষ্য করে ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের যৌথ হামলা চালানো হয়েছে।

অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা এখন তুঙ্গে।

এর জের ধরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর সামরিক হামলা জোরদার করেছে, আর পাল্টা জবাব হিসেবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা অব্যাহত রেখেছে।

বিশ্বনেতাদের যুদ্ধ আর অস্ত্রের সংঘাতের খেসারত শেষ পর্যন্ত দিতে যাচ্ছে সাধারণ মানুষ। লোহিত সাগরে যদি শান্তির বাতাস না ফেরে এবং সারের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায়, তবে সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ আর সাধারণ মানুষের পাতের ভাত অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক কূটনীতির এই খেলায় বাংলাদেশ কীভাবে নিজেকে রক্ষা করে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি