চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে মাদকের ভয়াল থাবার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাই যেন কাল হলো মো. মহিউদ্দিন (৩৬) নামে এক সামাজিক সংগঠকের জন্য।
মাদক কারবারের প্রতিবাদ করায় তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করার অভিযোগ উঠেছে এক চিহ্নিত মাদক কারবারির ক্যাডারের বিরুদ্ধে।
তবে এ বর্বরোচিত ঘটনার পর স্তব্ধ হয়ে থাকেনি এলাকা, ক্ষোভে ফেটে পড়া বিক্ষুব্ধ জনতা তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ গড়ে তুলে অভিযুক্তদের বসতঘর ও গোয়ালঘরে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালিয়েছে।
এতে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে মারা গেছে গোয়ালঘরে থাকা একটি গবাদিপশু।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টার দিকে উপজেলার শিকলবাহা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী মাস্টারহাট এলাকায় এ লঙ্কাকাণ্ড ঘটে।
পরবর্তীতে শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাতে ঘটনার চাঞ্চল্যকর তথ্য ও ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে চট্টগ্রামজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
আহত মহিউদ্দিন শিকলবাহার আহছানিয়া পাড়ায় সম্প্রতি গঠিত মাদকবিরোধী একটি সামাজিক সংগঠনের সক্রিয় কর্মী।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সমাজকে মাদকমুক্ত করার অঙ্গীকার নিয়ে এলাকার যুবকদের সঙ্গে নিয়ে তিনি ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থান নেন।
এর ধারাবাহিকতায় এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারি মুজিবুর রহমান ও তার অনুসারীদের সঙ্গে মহিউদ্দিনের বিরোধের সূত্রপাত ঘটে। পূর্ব শত্রুতার জের ধরে একাধিকবার তাদের মধ্যে বাক্যবিতণ্ডাও হয়েছিল।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর মাস্টারহাট এলাকায় মুজিবুর রহমানের প্রধান সহযোগী ইব্রাহিমের সঙ্গে মহিউদ্দিনের কথা-কাটাকাটি হয়।
তর্কের একপর্যায়ে ইব্রাহিম ক্ষিপ্ত হয়ে সঙ্গে থাকা ধারালো দা বের করে মহিউদ্দিনকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে রক্তাক্ত করে।
মহিউদ্দিনের চিৎকারে স্থানীয়রা ছুটে এসে তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করেন। বর্তমানে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এদিকে, অন্যায়ের প্রতিবাদকারী মহিউদ্দিনকে কুপিয়ে জখমের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ অগ্নিকুণ্ডে রূপ নেয়।
স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা একজোট হয়ে বিশাল মিছিল নিয়ে মাদক কারবারি মুজিবুর রহমানের ভাড়া বাসায় হামলা চালায়। উত্তেজিত জনতা ঘরবাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালানোর একপর্যায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।
মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়লে পাশে থাকা গোয়ালঘরে আটকে থাকা একটি গবাদিপশু জীবন্ত পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দীর্ঘ চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং পরিস্থিতি শান্ত করেন।
এলাকাবাসীর চরম ক্ষোভ, মুজিবুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রকাশ্যে ইয়াবার রমরমা কারবার চালিয়ে আসছিলেন।
কর্ণফুলী থানায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মাদকের মামলা রয়েছে। প্রায় দুই মাস জেল খাটাসূত্রে সম্প্রতি জামিনে বের হয়ে তিনি পুনরায় পুরনো কারবারে জাড়িয়ে পড়েন এবং নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী দিয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেন।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূর আহমেদ জানান, সম্প্রতি মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করাকে কেন্দ্র করে মাদক কারবারির সহযোগী ইব্রাহিমের সঙ্গে মহিউদ্দিনের বাকবিতণ্ডা হয়। সেসময় ইব্রাহিম দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল।
তারই জেরে বৃহস্পতিবার রাতে চায়ের দোকানে মহিউদ্দিনের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজিত জনতা অভিযুক্তদের বাড়িতে আগুন দেয়।
ওসি আরও জানান, ঘটনার পরপরই পুলিশ সরজমিনে এলাকা পরিদর্শন করেছে এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মহিউদ্দিনের খোঁজখবর নিয়েছে।
তবে এ ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কোনো পক্ষ লিখিত অভিযোগ দায়ের করেনি। অভিযোগ পাওয়া মাত্রই দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


