মেয়রের দরজায় অভিযান চালিয়েও অধরা ১৭ মামলার সন্ত্রাসী বগা

নগর ভবনে ১ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস থ্রিলার: পুলিশের ব্যর্থ অভিযান

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪:৪০

চট্টগ্রামের রাজপথ আর অপরাধ জগতে একের পর এক ঝোড়ো কাণ্ড ঘটিয়ে আবার আলোচনায় বহিষ্কৃত স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ও ১৭ মামলার আসামি ওয়াকিল হোসেন ওরফে ‘বিহারী বগা’।

গত সেপ্টেম্বরেই বাসার গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে পালিয়ে ছয় পুলিশ সদস্যকে রক্তাক্ত করা এই আলোচিত সন্ত্রাসী কি এবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) নগর ভবনেই আস্তানা গেড়েছিলেন?

এমনই এক বিস্ফোরক তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দিবাগত রাতে চসিকের টাইগারপাসস্থ প্রধান কার্যালয়ের সামনে ঘটে গেল এক রুদ্ধশ্বাস ও নাটকীয় ঘটনা।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নগর ভবনের পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে খুলশী থানা-পুলিশ।

পরিস্থিতি এতটাই থমথমে ছিল যে, ঘটনাস্থলে স্বশরীরে উপস্থিত হন সিএমপির উত্তর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. হাসান মোস্তফা স্বপন, অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) সোহেল পারভেজসহ পুলিশের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা।

নগর ভবনের বাইরে যখন ডিসি-এডিসিদের নেতৃত্বে বিশাল পুলিশ বহর অপেক্ষা করছে, ঠিক তখনই শুরু হয় আসল নাটক। বগার উপস্থিতির খবর পেয়ে চসিক কার্যালয়ের সামনে হুড়মুড় করে জড়ো হতে থাকেন তার অনুসারী ও স্থানীয় বিএনপি কর্মীরা।

মুহূর্তের মধ্যে পুলিশ ও সেখানে উপস্থিত লোকজনের মধ্যে শুরু হয় উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অভিযানে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র হট্টগোল। এর মধ্যেই পরিস্থিতির ভিডিও ধারণ করতে গেলে উপস্থিত সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হওয়ার ও শাসানোর অভিযোগ ওঠে মেয়রের বিরুদ্ধে।

তবে এক ঘণ্টারও বেশি সময় চসিক কার্যালয়ের বাইরে অবস্থান নিয়ে, ভেতরে প্রবেশ না করেই রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে অবশেষে খালি হাতে ফিরে যেতে বাধ্য হয় পুলিশ বাহিনী। রহস্যজনকভাবে অধরাই থেকে যান বিহারী বগা।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক এই যুগ্ম আহ্বায়ক শুধু রাজনীতির মাঠেই নয়, অপরাধ জগতেও এক আতঙ্কের নাম। শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড ও আধিপত্য বিস্তারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে গত ৮ জুন তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নগরীর খুলশী, পাহাড়তলী ও আকবর শাহ এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদকের সিন্ডিকেট, অবৈধ দখলবাজি এবং কিশোর গ্যাং লালন-পালনের পেছনে রয়েছে তার একক আধিপত্য। তার বিরুদ্ধে নগরের বিভিন্ন থানায় অন্তত ১৭টি মামলা ঝুলছে।

বগাকে গ্রেফতার করা কেন পুলিশের কাছে চ্যালেঞ্জিং, তার প্রমাণ মেলে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শুরুতে। খুলশীর ওয়ারলেস এলাকায় তাকে ধরতে গিয়ে রীতিমতো তাজ্জব বনে যায় পুলিশ।

সেখানে বাসার ভেতর তৈরি করা বিশেষ গোপন সুড়ঙ্গপথ দিয়ে অলৌকিকভাবে সটকে পড়েন বগা। আর তার ক্যাডারদের হামলায় খুলশী থানার ওসিসহ অন্তত ৬ জন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন, ভাঙচুর করা হয় পুলিশের গাড়িও।

এমনকি সম্প্রতি খুলশীতে উঠতি বয়সী কিশোর হৃদয় হত্যাকাণ্ডে জড়িত কুখ্যাত ‘সেভেন স্টার’ নামক কিশোর গ্যাং পরিচালনার পেছনেও এই বগা ও তার ভাইয়ের সরাসরি মদদ পাওয়ার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। গত ৪ অক্টোবর বগার তিন ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে গ্রেফতার করলেও মূল হোতা বগা রয়ে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে।

নগর ভবনের মতো একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের সামনে থেকে পুলিশ কেন খালি হাতে ফিরল, কিংবা বগা সত্যি ভেতরে ছিলেন কি না-তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে।

মঙ্গলবারের অভিযানের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইমস অ্যান্ড অপারেশন) মুহাম্মদ ফয়সাল আহমেদ ও উপকমিশনার মো. হাসান মোস্তফা স্বপনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি