আকাশে ওড়ছে অহিংসার ফানুস, ঘরে ঘরে লক্ষ্মী আবাহন

চট্টগ্রামজুড়ে সম্প্রীতি ও মৈত্রীর বাঁধভাঙা আনন্দ!

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১৬:৪০

কাঁচা পদ্ম, গাদা ফুলের সুবাস আর প্রদীপের সোনালি শিখায় ভোরের আলো ফুটতেই এক স্বর্গীয় সমাগম দেখা গেল চট্টগ্রাম নগরের গলিপথে।

একপাশে পরম শ্রদ্ধায় বুদ্ধমূর্তির চরণতলে পঞ্চশীল-অষ্টশীল গ্রহণের নীরব আকুতি, আর অন্যপাশে গৃহস্থের আঙিনায় চালের গুঁড়োর আলপনায় ধান-সম্পদের দেবীকে আবাহনের সুর।

পঞ্জিকার এক বিরল ও সুপবিত্র সংযোগে আজ (২৫ অক্টোবর) চট্টগ্রাম জুড়ে একসূত্রে গাঁথল দুই ভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের পুণ্যপ্রবাহ-বৌদ্ধদের দ্বিতীয় প্রধান উৎসব ‘শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা’ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ‘কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা’।

সকাল থেকেই ঐতিহ্যবাহী নন্দনকানন বৌদ্ধবিহার, কাতালগঞ্জ নবপণ্ডিত বিহার, পাথরঘাটা জেতবন শান্তিকুঞ্জ বিহার কিংবা চান্দগাঁও সার্বজনীন বৌদ্ধবিহারে ছিল সব বয়সি মানুষের উৎসবমুখর উপচে পড়া ভিড়।

হাতে প্রদীপের থালা, হরেক রকমের ফলমূল আর পদ্মফুল নিয়ে প্রবীণ থেকে শিশু-সবাই সমবেত হয়েছেন আত্মশুদ্ধির মঙ্গলালোকে।

সুদীর্ঘ তিন মাসের বর্ষাবাস শেষে অতীতের সব ভুল চুকিয়ে পারস্পরিক ক্ষমা প্রার্থনার এই দিনটি বৌদ্ধদের কাছে কেবল প্রথা নয়, বরং এক পরম আত্মশুদ্ধির দিন।

বিহারে এসে অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে পুণ্যার্থী তৃপ্তি বড়ুয়া বলেন, প্রবারণা পূর্ণিমা আমাদের কাছে শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, আত্মশুদ্ধি ও নিজের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার দিন। প্রার্থনা করি, পৃথিবী থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর হোক, সবার জীবন শান্তিময় হোক।

দিনভর সংঘদান, বুদ্ধপূজা ও পিণ্ডদানের পর পুরো নগরের চোখ এখন বিকালের ঢলে পড়া সূর্যের দিকে। নামবে সন্ধ্যা, আর অমনি আকাশে উড়বে মুক্তির প্রতীক হয়ে ওঠা রঙের ফানুস।

প্রচলিত বিশ্বাসে গগনে বুদ্ধের ‘কেশধাতু চেতিয়’ বা স্মারক চিহ্নের উদ্দেশ্যে ভক্তদের শ্রদ্ধা পৌঁছাতে আয়োজকেরা সাজিয়েছেন নানা বৈচিত্র্যময় প্রস্তুতি।

শুধু প্রচলিত বৃত্তাকার ফানুসই নয়, তরুণদের হাতে হাত মিলিয়ে রূপ নিয়েছে হাতি, ময়ূর, মাছ, মটকা ও নানাবিধ কারুকার্যময় ফানুস। যার গায়ে নিপুণ আঁকিবুঁকিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বুদ্ধের অহিংস বাণী। প্রায় ৭০টি সংগঠনের অংশগ্রহণে আকাশ ছোঁবে সম্প্রীতির এই চিরন্তন বার্তা।

দেবাশীষ বড়ুয়া নামের এক তরুণ বললেন, ছোটবেলা থেকেই এই দিনের অপেক্ষায় থাকি। আকাশে যখন একসঙ্গে শত শত ফানুস ভেসে ওঠে, তখন হৃদয়ে যে অনুভূতি জাগে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

ঠিক সেই একই পূর্ণিমা তিথিতে বাঙালি হিন্দু ঘরে ঘরে শুরু হয়েছে ধনধান্য ও সৌভাগ্যের প্রতীক দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা। ঘট, ধানের ছড়া, আম্রপল্লব আর প্রদীপের শোভায় সাজানো হয়েছে পূজামণ্ডপ ও গৃহকোণ।

সনাতন পঞ্জিকামতে বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে শুরু হওয়া এই পূর্ণিমা তিথিতে সারা রাত জেগে ভক্তিভরে পাঠ করা হচ্ছে লক্ষ্মীর পাঁচালি।

অমঙ্গল তাড়িয়ে আলো আর আনন্দের প্রতীক হিসেবে দেবী লক্ষ্মীর আগমন কামনায় ব্রত পালন করছেন রমণীরা।

একই দিনে দুটি প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উদযাপনে পুরো নগরীতে ছড়িয়ে পড়েছে এক আনন্দঘন সম্প্রীতির আবহ। নন্দনকানন, চেরাগী পাহাড় ও মোমিন রোড এলাকাসহ পুরো চট্টগ্রাম নগরে যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তুলেছে পুলিশ প্রশাসন।

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহেদুল কবির জানান, উৎসবে আসা প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত সাদাপোশাক ও ইউনিফর্মধারী পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং সার্বিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ও শান্তিপূর্ণ রয়েছে।

আকাশে ভাসতে থাকা রঙিন ফানুসের আলো আর মণ্ডপে বেজে ওঠা কাঁসরের শব্দে আজ চট্টগ্রাম যেন এক অখণ্ড সম্প্রীতির ক্যানভাস।

দুই ভিন্ন আচারের মূলে একটাই আকুতি-হিংসা-বিদ্বেষহীন এক আলোকময় ও শান্তিময় পৃথিবী।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি