back to top

যেসব কারণে দেশে এমএস রডের বাজার ঊর্ধ্বগতি

প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৮:২৪

আন্তর্জাতিক বাজারে ফেরাস স্ক্র্যাপের দাম বাড়তে শুরু করায় বাংলাদেশে এমএস বার (রড)–এর বাজারেও ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে।

মিল ও বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি স্ক্র্যাপের রিপ্লেসমেন্ট কস্ট (পুনরায় আমদানির খরচ) বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় বাজারে দাম সমন্বয়ের চাপ তৈরি হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, গত কয়েক সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের দাম প্রায় ২০–৩০ ডলার/টন বেড়েছে।

এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে—বিশ্বের বড় স্ক্র্যাপ আমদানিকারক দেশ তুরস্কের পুনরায় বড় পরিসরে কেনা, পাশাপাশি শীতকালীন কারণে পশ্চিমা দেশগুলোতে স্ক্র্যাপ সংগ্রহ ও সরবরাহে ঘাটতি।

তুরস্কের কেনা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ঊর্ধ্বমুখী
‘তুরস্ককে বৈশ্বিক স্ক্র্যাপ বাজারের “বেঞ্চমার্ক” ধরা হয়—কারণ দেশটি সমুদ্রপথে স্ক্র্যাপ আমদানির অন্যতম বড় কেন্দ্র।

তুরস্কের মিলগুলো যখন নিয়মিত কার্গো বুকিং শুরু করে, তখন বিশ্বের অন্যান্য গন্তব্যেও স্ক্র্যাপের প্রাপ্যতা টানাটানি হয়ে পড়ে এবং দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়,’—বলেন কয়েকজন আমদানিকারক।

পশ্চিমা দেশে শীতকালীন ঘাটতি, সরবরাহে চাপ
‘স্ক্র্যাপ খনি থেকে ওঠে না—এটি সংগ্রহনির্ভর। শীতে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় স্ক্র্যাপ সংগ্রহ, পরিবহন ও বন্দর-লজিস্টিকস ধীর হয়ে যায়।

ফলে বাজারে তাৎক্ষণিক সরবরাহ কমে গিয়ে বিক্রেতারা উচ্চদামে অফার দেয়’—বলছেন সংশ্লিষ্টরা। এই মৌসুমি সংকোচন আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতিকে আরও জোরালো করছে।

ভারতের আমদানি চাহিদাও প্রভাব ফেলছে
দক্ষিণ এশিয়ায় স্ক্র্যাপ প্রবাহে ভারতের ভূমিকা বড়। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারত যখন আমদানি বাজারে সক্রিয় থাকে, তখন একই উৎস থেকে স্ক্র্যাপ সংগ্রহে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের প্রতিযোগিতা বাড়ে—ফলে প্রাপ্যতা কমে এবং দাম ওঠে।

দেশে রডের দাম সমন্বয়: কোথাও টনপ্রতি ১,০০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি
আন্তর্জাতিক স্ক্র্যাপের দাম বাড়ায় দেশে রডের বাজারেও প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, কয়েকটি মিল ও ডিলার পর্যায়ে টনপ্রতি প্রায় ১,০০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।

মিলগুলোর ভাষ্য, উচ্চ দামে কাঁচামাল বুকিং হলে দেশীয় বাজারে দীর্ঘদিন আগের কম দামে বিক্রি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না—কারণ এতে উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি করতে হয়।

শিল্পনেতারা বলছেন, বড় ধরনের সংশোধন “অনেক দিন ধরেই বকেয়া”
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ)-এর সাবেক সভাপতি এবং আনোয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান মানওয়ার হোসাইন বলেন, “মহামারির পর থেকে স্টিল শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পগুলোর একটি।

দীর্ঘদিন ধরে নেগেটিভ রিটার্নের কারণে ব্যাপক ক্যাপিটাল ইরোশন হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।”

তার মতে, “একটি বড় দাম সংশোধন অনেক দিন ধরেই বকেয়া। দাম সমন্বয় শুধু আন্তর্জাতিক স্ক্র্যাপ বাজারের অস্থিরতার প্রতিক্রিয়া নয়—দীর্ঘ সময় ধরে খরচের নিচে দামে বিক্রির পর এটি একটি স্বাভাবিক বাজারগত গতিবিধিও।”

বিএসএমএ’র সেক্রেটারি জেনারেল সুমন চৌধুরী একই কথা জানিয়ে বলেন, নির্মাণ খাতে দীর্ঘমেয়াদি মন্দা অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলতে পারে।

“সরকার ও নতুন সরকারকে দ্রুত বেসরকারি খাতের সঙ্গে বসে পুরো নির্মাণ শিল্প পুনরুজ্জীবনে কাজ করতে হবে,” বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, “নির্মাণ খাতের সঙ্গে প্রায় ৩,৬০০টি শিল্প যুক্ত। নির্মাণ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই ঢেউ ৩,৬০০ শিল্পে ছড়িয়ে পড়ে।”

বাজারে আগ্রহ বাড়াতে বাস্তবতা জানা জরুরি
বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন কম দামে বাজার থাকায় অনেক ক্রেতা ‘অপেক্ষা করে দেখি’ মনোভাব নিয়েছেন।

কিন্তু আন্তর্জাতিক স্ক্র্যাপের দাম বাড়লে এবং রিপ্লেসমেন্ট কস্ট ওপরে উঠলে দেশীয় বাজারেও দাম সমন্বয় অনিবার্য হয়ে পড়ে।

এ অবস্থায় নির্মাণসামগ্রীর বাজারে আগাম ক্রয় পরিকল্পনা, স্থিতিশীল সরবরাহ এবং বাস্তবসম্মত দাম—সবই গুরুত্বপূর্ণ।

সামনে কী দেখবেন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কিছুদিন তিনটি সূচক নজরে রাখা দরকার—
১. তুরস্কের স্ক্র্যাপ বুকিংয়ের গতি
২. ইউরোপ/যুক্তরাষ্ট্রে শীতকালীন সংগ্রহ পরিস্থিতি
৩. বাংলাদেশে কাঁচামালের রিপ্লেসমেন্ট কস্ট ও মিলগুলোর উৎপাদন ব্যয়

মোট কথা, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে যে সংকেত আসছে তা হলো—বিশ্ববাজারে স্ক্র্যাপের দাম বাড়লে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ‘খরচের নিচে দামে’ থাকা রড বাজারও বেশি দিন একই জায়গায় স্থির থাকতে পারে না।