চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক দল ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম কমিটি টানা তৃতীয় দিনের মতো সোমবারও (২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে পূর্ণ কর্মবিরতিতে রয়েছে শ্রমিক কর্মচারীরা। আজ বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলবে এ কর্মবিরতি।
শ্রমিক-কর্মচারীদের টানা কর্মবিরতির কারণে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
গতকাল রবিবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত কর্মবিরতির ফলে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস, লোডিং-আনলোডিং কার্যক্রম কার্যত বন্ধ ছিল।
এতে জেটি থেকে জাহাজ ছাড়তে বিলম্ব হয় এবং বন্দর ইয়ার্ড থেকে কোনো পণ্য খালাস করা যায়নি।
তারও আগের দিন শনিবার একই সময় কর্মবিরতি পালন করা হয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) বন্দর এলাকায় এক মাসের জন্য সভা-সমাবেশ, মিছিল ও শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করেছে।
সিএমপির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখা, যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের ট্রাফিক বিভাগ বন্দর ব্যবহারকারীদের উদ্দেশে কোনো গুজবে কান না দিয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানালেও বাস্তবে শ্রমিক-কর্মচারীদের অংশগ্রহণ না থাকায় বন্দর কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশিদের হাতে ইজারার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কর্মবিরতি পালন করা আরও ১২ কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে। এ নিয়ে মোট ১৬ জনকে বদলি করা হয়েছে।
রোববার সিপিএর প্রধান জনবল কর্মকর্তার জারি করা দুটি পৃথক অফিস আদেশে এসব বদলি করা হয়।
এক বদলির আদেশে ৭ জনের নাম রয়েছে। তারা হলেন- পরিবহন বিভাগের উচ্চ বহিঃসহকারী মোহাম্মদ শফি উদ্দিন ও রাশিদুল ইসলাম, পরিকল্পনা বিভাগের স্টেনো টাইপিস্ট মো. জহিরুল ইসলাম, বিদ্যুৎ বিভাগের এসএস পেইন্টার হুমায়ুন কবির, প্রশাসন বিভাগের উচ্চমান সহকারী মো. শাকিল রায়হান, যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার মানিক মিঝি ও প্রকৌশল বিভাগের মেসন মো. শামসু মিয়া।
এর মধ্যে চারজনকে ঢাকার কমলাপুর কনটেইনার ডিপোয় ও তিনজনকে ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনালে বদলি করা হয়েছে।
আরেকটি আদেশে যে পাঁচজনের নাম রয়েছে তারা হলেন- উচ্চ বহিঃসহকারী আবদুল্লাহ আল মামুন, স্টেনো টাইপিস্ট খন্দকার মাসুদুজ্জামান, ড্রাইভার মো. লিয়াকত আলী ও আমিনুর রসুল বুলবুল এবং খালাসি মো. রাব্বানী। তাদের পানগাঁও আইসিটিতে সংযুক্ত করা হয়েছে।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) বদলি বা পদায়নকৃত কর্মস্থলে যোগদান করতে বলা হয়েছে।
এর আগে, ৩১ জানুয়ারি অডিট সহকারী মো. হুমায়ুন কবীর (অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগ), ইঞ্জিন ড্রাইভার মো. ইব্রাহিম খোকন (১ম শ্রেণি-নৌ বিভাগ) উচ্চ হিসাব সহকারী মো. আনোয়ারুল আজিম (অর্থ ও হিসাব বিভাগ), এসএস খালাসি মো. ফরিদুর রহমানকে (প্রকৌশল বিভাগ) বদলি করা হয়েছিল।
বদলির প্রতিবাদে আজ সোমবার শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) চট্টগ্রাম বন্দর অভিমুখে কালো পতাকা মিছিলের ঘোষণা দিয়েছে। স্কপের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কালো পতাকা হাতে কর্মসূচি পালনের কথা জানানো হয়।
একই সঙ্গে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম কমিটির সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে আজও পূর্ণ কর্মবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের চট্টগ্রাম থেকে অন্যত্র বদলি ও স্ট্যান্ড রিলিজ করছে।
এতে আন্দোলন আরও তীব্রতর হবে। আগামীকাল সকাল ৮টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত কর্মবিরতি কর্মসূচি চলবে।’
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, ‘আন্দোলন চলমান থাকবে। বদলি করে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না।’
বন্দরে কর্মবিরতি সম্পর্কে চট্টগ্রাম বন্দর বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ফজলে একরাম চৌধুরী জানান, শ্রমিক বুকিং দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও শ্রমিকরা বুকিং নিচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘শুধু শ্রমিক নয়, কর্মচারীরাও কলম বিরতিতে রয়েছেন। কোনো কাগজে স্বাক্ষর না করায় প্রশাসনিক কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পুরো বন্দরে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, এনসিটি নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত এবং এখানে পর্যাপ্ত হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্টসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো রয়েছে। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার আমলে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এর নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। ২০০৭ সালে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়।
বন্দর সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে এনসিটিতে নতুন করে বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। তবে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ জরুরি।


