একসময় জঙ্গল সলিমপুরকে অনেকে বলতেন ‘স্টেট উইথিন স্টেট’। সেখানে কার্যত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
সন্ত্রাসীরা নিজেদের মতো করে জমি বরাদ্দ দিত, বিদ্যুৎ–সংযোগ নিত, গড়ে তুলত নানা অবকাঠামো। পুরো এলাকাই ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। তবে সেই বাস্তবতা এখন বদলাতে শুরু করেছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেছেন, ‘কিন্তু এভাবে তো একটি দেশ চলতে পারে না।’
তিনি জানান, নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জঙ্গল সলিমপুরকে রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা হয়।
সমন্বিত উদ্যোগে সেই চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কোনো ধরনের প্রাণহানি ছাড়াই পুরো অভিযান সম্পন্ন হয়েছে।
আজ রোববার (২৬ এপ্রিল) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
দীর্ঘদিনের আতঙ্কের অবসান
জেলা প্রশাসক বলেন, জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের মধ্যে একধরনের শঙ্কা কাজ করত। কখন কী ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যায়, সেই আশঙ্কা ছিল সব সময়। অতীতের ঘটনাপ্রবাহও ছিল উদ্বেগজনক। বহুবার দেখা গেছে, সন্ত্রাসীরা নিরীহ মানুষকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে।
তবে এবার তাদের সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। নির্বাচনের সময় প্রশাসনিক ব্যস্ততার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে বড় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু নির্বাচন শেষে দ্রুত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় এবং অভিযান পরিচালনা করা হয়।
সুপরিকল্পিত অভিযানে সাফল্য
মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, অভিযানে অংশ নেওয়া সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল—কোনো নিরীহ মানুষ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন। অভিযান শুরুর আগে ড্রোনের মাধ্যমে পুরো এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়। এরপর সুপরিকল্পিতভাবে অভিযান পরিচালিত হয়।
তিনি বলেন, সব বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টাতেই এই সফলতা এসেছে।
সাধারণ মানুষের জন্য নতুন উদ্যোগ
জেলা প্রশাসক বলেন, সরকার নিরপরাধ ও অসহায় মানুষের জন্য কাজ করছে। সলিমপুরে সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্য ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছে। হাম ও রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিও পরিচালিত হয়েছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ মানুষের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, সেখানে ইতিমধ্যে দুটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।
অবকাঠামো উন্নয়নে মাস্টারপ্ল্যান
জঙ্গল সলিমপুরের সার্বিক উন্নয়নের জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন সড়ক নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন মিললে দ্রুত কাজ শুরু হবে।
এর আগে অনুমোদিত হলেও বাস্তবায়িত হয়নি—এমন কিছু সরকারি স্থাপনাও এখন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জেলা কারাগার, র্যাব, সেনাবাহিনী ও পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা স্থাপনের আবেদন নিয়েও কাজ চলছে।
ভূমি সিন্ডিকেট বন্ধে ভূমি অফিস
মানুষের সুবিধার্থে সেখানে একটি ভূমি অফিস স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে জমি–সংক্রান্ত সিন্ডিকেট বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে প্রশাসন। খুব শিগগিরই এই অফিসের কার্যক্রম শুরু হবে।
পাশাপাশি সেখানে বসবাসরত মানুষকে আইনানুগ কাঠামোর মধ্যে পুনর্বাসনের বিষয়েও কাজ চলছে।
ফিরছে স্বস্তি ও নিরাপত্তা
জেলা প্রশাসক বলেন, এখন সলিমপুরের সাধারণ মানুষ নিজেদের অনেক বেশি নিরাপদ মনে করছেন। তাঁরা ভয়মুক্তভাবে জীবনযাপন ও ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারছেন।
‘ব্যক্তিগতভাবে আমি অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। কেউ আর চাঁদাবাজির অভিযোগ করেননি,’ বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতা এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতায়। ভবিষ্যতেও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হবে। সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা হবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



