কুমিল্লার রাত তখন গভীর। দূরপাল্লার বাস থেকে নেমে বাসায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী (৩৫)।
চট্টগ্রাম থেকে কর্মস্থল কুমিল্লায় ফিরে হয়তো ভাবতেও পারেননি, কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে মৃত্যুফাঁদ।
একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চালক ও যাত্রীর ছদ্মবেশে ওত পেতে ছিল সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যরা। লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে পাতা সেই ফাঁদ শেষ পর্যন্ত কেড়ে নেয় এক তরুণ সরকারি কর্মকর্তার প্রাণ।
কুমিল্লায় বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার পাঁচ আসামির মধ্যে চারজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
তাঁদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে পরিকল্পিত ছিনতাই, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের কৌশল এবং বুলেট বৈরাগীকে হত্যা করার নির্মম বর্ণনা।
আদালত সূত্র বলছে, এই স্বীকারোক্তি মামলার তদন্তে নতুন গতি এনেছে।
স্বীকারোক্তি দেওয়া চার আসামি হলেন কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার (শহরতলি) ধর্মপুর এলাকার মৃত নুর ইসলামের ছেলে মো. সোহাগ (৩৪), মৃত সজল মিয়ার ছেলে মো. সুজন (৩২), আমড়াতলী এলাকার আমির হোসেনের ছেলে এমরান হোসেন ওরফে হৃদয় (৩৪) এবং আড়াইওড়া এলাকার মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে রাহাত হোসেন ওরফে জুয়েল (২৭)। তাঁরা প্রত্যেকে হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে, ধর্মপুর এলাকার মৃত হারুন মিয়ার ছেলে ইসমাইল হোসেন ওরফে জনি (২৮) আদালতে বিচ্ছিন্নভাবে বক্তব্য দেন।
পরে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার কোটবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) টিটু কুমার নাথ।
শুনানি শেষে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (ষষ্ঠ) আদালতের বিচারক আবিদা সুলতানা (মলি) তাঁর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শুক্রবার দিবাগত গভীর রাতে চট্টগ্রাম থেকে বাসে করে কুমিল্লায় পৌঁছান বুলেট বৈরাগী। বাস থেকে নামার পরই তাঁকে লক্ষ্যবস্তু বানায় ছিনতাইকারী চক্রটি।
আগে থেকেই একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চালক ও যাত্রীর বেশে অবস্থান নেয় তারা। সুযোগ বুঝে বুলেট বৈরাগীকে অটোরিকশায় তোলে। এরপর শুরু হয় ছিনতাইয়ের চেষ্টা। একপর্যায়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
র্যাব-১১, সিপিসি-২ কুমিল্লার কোম্পানি কমান্ডার মেজর সাদমান ইবনে আলম জানান, গ্রেপ্তার পাঁচজনের মধ্যে চারজন সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। মো. সুজন ছিলেন সহায়তাকারী। তাঁর কাছ থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে বুলেট বৈরাগীর মুঠোফোন।
গ্রেপ্তারের সময় তাঁদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র, ব্যবহৃত সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং ভুক্তভোগীর লুণ্ঠিত মালামালও উদ্ধার করা হয়েছে।
এর আগে রোববার রাতে কুমিল্লা নগরসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে র্যাব এই পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। পরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
এরপর গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়। সেখান থেকে তাঁদের আদালতে নেওয়া হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই টিটু কুমার নাথ জানান, আদালতে হাজির করার পর পাঁচ আসামির মধ্যে চারজন স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
তবে ইসমাইল হোসেন বিচ্ছিন্নভাবে কথা বলায় তাঁকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়েছে। তদন্তে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি।
বুলেট বৈরাগী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের বাবুপাড়া এলাকার বাসিন্দা সুশীল বৈরাগীর ছেলে।
তিনি কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। চাকরির সুবাদে কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন।
এই হত্যাকাণ্ড রাতের শহরে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাস থেকে নামার পর যাত্রীদের লক্ষ্য করে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের এমন তৎপরতা নগর নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে এনে দিয়েছে।
বুলেট বৈরাগীর মর্মান্তিক মৃত্যু জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য এক কঠিন সতর্কবার্তা।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



