চতুর্থ বিবাহবার্ষিকীর আনন্দ তখনও ফিকে হয়নি। সামনে ছিল একমাত্র ছেলে অব্যয় বৈরাগীর প্রথম জন্মদিন।
ঘরে ঘরে চলছিল ছোট্ট আয়োজনের পরিকল্পনা। বাবা হিসেবে বুলেট বৈরাগীর উচ্ছ্বাস ছিল অন্যরকম।
ছেলের প্রথম জন্মদিনে বড় কেক কাটবেন, অনেক ছবি তুলবেন, স্মৃতিতে ধরে রাখবেন প্রতিটি মুহূর্ত—এমন কত স্বপ্নই না ছিল তাঁর।
কিন্তু নিয়তি যেন অন্য এক গল্প লিখে রেখেছিল। জন্মদিনের মাত্র দুই দিন আগে, আর বিবাহবার্ষিকীর কয়েক দিনের মাথায়, বুলেট ফিরলেন ঠিকই—তবে জীবিত নয়, কফিনবন্দী হয়ে।
যে মানুষটি পরিবারের কাছে ফিরছিলেন আনন্দ নিয়ে, তিনি পৌঁছালেন নিথর দেহ হয়ে।
চট্টগ্রামে প্রশিক্ষণ শেষে শুক্রবার রাতে কুমিল্লার বাসার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন বুলেট। স্ত্রী-সন্তানের কাছে ফেরার সেই যাত্রাই হয়ে উঠল তাঁর জীবনের শেষ যাত্রা।
পরিবারের সঙ্গে শেষবার কথা বলে জানিয়েছিলেন, আর বেশি সময় লাগবে না, শিগগিরই পৌঁছে যাবেন। কে জানত, সেটিই হবে তাঁর শেষ আশ্বাস, শেষ কণ্ঠস্বর!
কুমিল্লায় বাস থেকে নেমে বাড়ি ফেরার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠেছিলেন তিনি। বাইরে থেকে সেটি ছিল সাধারণ একটি যাত্রা, কিন্তু ভেতরে অপেক্ষা করছিল মৃত্যু।
চালকসহ চারজন ছিনতাইকারী যাত্রী সেজে বসেছিল সেখানে। ‘আর একজন হলেই ছেড়ে দেব’—এই আশ্বাসে নিশ্চিন্তে বসে পড়েছিলেন বুলেট। সেই নিশ্চিন্ত মুহূর্তই হয়ে উঠল তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর ভুল।
কিছুক্ষণ পরই অস্ত্রের মুখে তাঁকে জিম্মি করা হয়। লুটে নেওয়া হয় তাঁর সঙ্গে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র।
এরপর নির্মমভাবে মারধর করে চলন্ত সিএনজি থেকে তাঁকে ফেলে দেওয়া হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে। মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই থেমে যায় এক সংগ্রামী জীবনের সব স্বপ্ন, সব পরিকল্পনা।
পরদিন সকালে রাস্তার পাশে পড়ে থাকা তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
যে মানুষটি রাতভর পরিবারের কাছে ফেরার স্বপ্ন দেখছিলেন, তিনি তখন নীরব, নিশ্চুপ। তাঁর ফোনে আর কোনো কল ধরা পড়েনি। তাঁর কণ্ঠ আর শোনা যায়নি।
বুলেট বৈরাগী শুধু একজন কাস্টমস কর্মকর্তা ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক পরিবারের ভরসা, এক গ্রামের গর্ব, অসংখ্য স্বপ্নের নাম। ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর পরিবারে ফিরেছিল স্বস্তি। দরিদ্র কৃষক বাবার বহু বছরের ত্যাগ, মায়ের অশ্রু আর সংগ্রামের প্রতিফলন ছিল এই সাফল্য।
বুলেটের মা নীলিমা বৈরাগীর কণ্ঠে আজও ঘুরে ফিরে আসে সেই শেষ রাতের স্মৃতি।
তিনি বলেছিলেন, ‘ওর কথাবার্তা আমি চিনতাম। পরে ফোনে যে ভাষা শুনেছি, তখনই বুঝেছিলাম—এটা আমার ছেলের ভাষা না।’ মায়ের সেই আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত নির্মম সত্যে পরিণত হয়।
আজ অব্যয়ের প্রথম জন্মদিন। কিন্তু জন্মদিনের সবচেয়ে বড় উপহার, সবচেয়ে বড় উপস্থিতি—তার বাবা—নেই।
যে বাবা ছেলের জন্য কেক কাটার পরিকল্পনা করেছিলেন, সেই বাবা আজ মাটির নিচে শায়িত। ছোট্ট অব্যয় এখনও বোঝে না, কেন সবাই কাঁদছে, কেন তার বাবাকে আর দেখা যাচ্ছে না।
স্ত্রী উর্মি হীরা এখনও বিশ্বাস করতে পারেন না, তাঁর স্বামী আর ফিরবেন না। যে মানুষটির সঙ্গে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনেছিলেন, যাঁর সঙ্গে সংসারের প্রতিটি দিন ভাগ করে নিয়েছিলেন, তিনি আজ শুধুই স্মৃতি। বিবাহবার্ষিকীর ছবিগুলো এখন তাঁর কাছে অমূল্য, কিন্তু অসহনীয়ও।
ডুমুরিয়া গ্রাম আজ স্তব্ধ। যে গ্রামের মানুষ একসময় বুলেটের চাকরির জন্য দোয়া করেছিল, সেই গ্রামই আজ তাঁর জন্য কাঁদছে। উঠোনে, গাছে, বাতাসে—সবখানে যেন শোকের ভার।
এক রাতের ছিনতাই, একজন মানুষকে হত্যা-থামিয়ে দিয়েছে একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি শিশুর ভবিষ্যতের স্মৃতি, বাবা-মায়ের শেষ ভরসা, স্ত্রীর সমস্ত আশা।
বুলেট এক অপূরণীয় শূন্যতা, এক অসমাপ্ত গল্প, এক পরিবারের অনন্ত কান্না।
তাঁর বাবা-মায়ের বুকে যে আগুন জ্বলছে, তা কোনোদিন নিভবে না। আর অব্যয়ের প্রথম জন্মদিন চিরকাল মনে করিয়ে দেবে—এই দিনেই তার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপস্থিতি, তার বাবা।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



