back to top

নদীর আর্তনাদ পৌঁছাল ৩০ ঘাটে-সাম্পানের মঞ্চে কর্ণফুলী রক্ষার ডাক

প্রকাশিত: ০৮ মে, ২০২৬ ১৬:০১

কর্ণফুলী শুধু একটি নদী নয়, চট্টগ্রামের অস্তিত্ব সংকটের প্রতীক। একদিকে দখল, অন্যদিকে শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য—দুই চাপের মাঝে ক্রমেই প্রাণ হারাচ্ছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ নদী।

সেই সংকটের কথাই এবার পৌঁছে গেল নদীপারের ঘাটে ঘাটে, মানুষের দোরগোড়ায়।

সাম্পানের ভাসমান মঞ্চে গান, নৃত্য, প্রতিবাদ আর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে উচ্চারিত হলো একটাই দাবি—কর্ণফুলীকে বাঁচাতে হবে।

শুক্রবার (৮ মে) সকাল ৯টায় নগরের সদরঘাট থেকে শুরু হয়ে লাম্বুরহাট পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীর উভয় তীরে চলে ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন ‘বিনি সুতার মালা’।

চট্টগ্রাম ইতিহাস সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র ও কর্ণফুলী নদী সাম্পান মাঝি কল্যাণ সমিতি ফেডারেশনের উদ্যোগে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘সাম্পান খেলা ও চাঁটগাইয়া সংস্কৃতি মেলা’র প্রথম দিনের এ কর্মসূচিতে নদীপারের অন্তত ৩০টি ঘাট ও জনবসতিতে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করা হয়।

ভাসমান নৌযানে তৈরি অস্থায়ী মঞ্চ থেকে সদরঘাট, চরপাথরঘাটা, নয়াহাট, কালুরঘাট, বোয়ালখালী ও লাম্বুরহাটসহ বিভিন্ন ঘাটে আঞ্চলিক গান, নৃত্য ও বক্তব্য পরিবেশন করা হয়।

মাঝিদের অধিকার, নদী দখলমুক্তকরণ, দূষণ প্রতিরোধ এবং কর্ণফুলীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার বার্তা তুলে ধরা হয় প্রতিটি আয়োজনে।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, কর্ণফুলী নদী এখন দখল ও দূষণের ভয়াবহ চাপে জর্জরিত। উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও নদীতীরে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হচ্ছে না। বরং একটি প্রভাবশালী মহল নদী দখল ও দূষণের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে যাচ্ছে।

তাঁরা অভিযোগ করেন, নদী দূষণের সবচেয়ে বড় দায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর। নদীর তীরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন কলকারখানা প্রতিনিয়ত বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ ফেলে কর্ণফুলীকে বিষাক্ত করে তুলছে।

বক্তারা শিল্পকারখানাগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) ব্যবহারের দাবি জানান।

চট্টগ্রাম ইতিহাস সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান সাংবাদিক আলীউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন কর্ণফুলী নদী সাম্পান মাঝি কল্যাণ সমিতি ফেডারেশনের উপদেষ্টা মির্জা ইসমাইল। উদ্বোধন করেন মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ডা. মাহজুর রহমান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে চৌধুরী ফরিদ বলেন, “কর্ণফুলী নদী বাঁচলে চট্টগ্রাম বাঁচবে, কর্ণফুলী নদী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে।” তিনি কর্ণফুলী রক্ষায় ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের’ দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

একই সঙ্গে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের অব্যবস্থাপনার সমালোচনা করে বলেন, অপরিকল্পিত ড্রেজিংয়ে কর্ণফুলীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট হচ্ছে।

প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খালেদা জিয়া স্মৃতি সংসদ চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সদস্যসচিব ইঞ্জিনিয়ার জসিম উদ্দিন।

অনুষ্ঠানে আলীউর রহমান অভিযোগ করেন, অভয়মিত্র ঘাটে শস্য খালাসের আড়ালে লাইটার জেটিতে শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য খালাস করা হচ্ছে।

স্ক্র্যাপ ও রাসায়নিক পদার্থ নদীতে পড়ে পানি দূষণের পাশাপাশি আশপাশের এলাকায় বায়ু দূষণও সৃষ্টি করছে। এতে সামুদ্রিক প্রাণ বৈচিত্র্য ও নদী পারের মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে।

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে কঠোর প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হবে।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মির্জা বাহার উদ্দিন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এম মঈন উদ্দিন, সেলিম খান, জসিম উদ্দিন, এম পেয়ার আলী, জাফর আহমদ, লোকমান দয়াল, মুছা মেম্বার, এম মুছা সিকদার, রমজান আলী রমু, বাহাদুর, মাহবুব আলম, আকিব জাবেদ, সালাউদ্দিন, রানা ও গাজীসহ অনেকে। মঞ্চে নৃত্য পরিবেশন করেন রাইটেন দাশ ও তাঁর দল।

আয়োজকেরা জানান, শনিবার (৯ মে) বেলা ১১টায় নগরের অভয়মিত্র ঘাট থেকে সাম্পান শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।

আর রোববার বিকেল ৩টায় অভয়মিত্র ঘাট থেকে চরপাথরঘাটা সিডিএ মাঠে অনুষ্ঠিত হবে সাম্পান খেলা ও চাঁটগাইয়া সংস্কৃতি মেলা।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি