ইয়াবার টাকার দ্বন্দ্বে নৃশংসতা। এক বাক্যেই ধরা পড়ে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার উঁচুর বিল পুরানগড় এলাকার সেই শীতল-রক্তের হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা, যেখানে লোভ, বিশ্বাসঘাতকতা আর অপরাধ একসঙ্গে মিশে কেড়ে নিয়েছিল এক কিশোরের জীবন।
২০২২ সালের ১৭ জুলাই রাত। গ্রামের পরিবেশ তখনও স্বাভাবিক। বন্ধুদের সঙ্গে ক্যারাম খেলছিল কিশোরটি। কিন্তু সেই রাতই তার জীবনের শেষ রাত হয়ে উঠবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
প্রতিবেশী এবং পরিচিত অটোরিকশাচালক মো. পারভেজ (২৪), যার সঙ্গে ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, সেই মানুষই পেতে রাখে মৃত্যুর ফাঁদ।
জবানবন্দিতে পারভেজ জানায়, কিশোরটি নিয়মিত তার অটোরিকশায় বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করত এবং বিনিময়ে দিত দ্বিগুণ ভাড়া।
প্রথমে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হলেও একসময় সে বুঝতে পারে—এই যাতায়াতের আড়ালে চলছে ইয়াবা পাচার।
এরপরই তার মাথায় চাপে লোভ। কিশোরের কাছে ইয়াবা ব্যবসার লাভের অংশ দাবি করে বসে পারভেজ। কিন্তু কিশোর রাজি হয়নি। আর সেই অস্বীকৃতিই হয়ে ওঠে তার মৃত্যুদণ্ড।
ঘটনার রাতে সাকিব নামের এক তরুণকে দিয়ে ক্যারম খেলা থেকে কিশোরকে ডেকে আনা হয় স্থানীয় একটি কলেজ মাঠে। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল পারভেজসহ কয়েকজন।
প্রথমে ইয়াবা ও টাকা দাবি করা হয়। কিশোরের পকেট থেকে টাকার বান্ডিল ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় নির্মম নির্যাতন।
মারধর করতে করতে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় পাশের একটি সেতুর ওপর। হাত-পা চেপে ধরে রাখা অবস্থায় কিশোরটি বারবার আকুতি জানায়—“আমার সব নিয়ে যাও, তবু প্রাণে বাঁচতে দাও।”
কিন্তু সেই আর্তনাদ থামাতে সময় লাগেনি ঘাতকদের। সহযোগী হাসান বলে ওঠে—“তাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না, বেঁচে থাকলে সব বলে দেবে।”
এরপর ধারালো কোদাল দিয়ে কিশোরের পা ও গলায় আঘাত করা হয়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পরও থামেনি নিষ্ঠুরতা। মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। যেন নিশ্চিত করা হয়—কোনোভাবেই সে আর ফিরে এসে সত্য প্রকাশ করতে না পারে।
হত্যার পর শুরু হয় প্রমাণ গোপনের চেষ্টা। পাহাড়ে গর্ত খুঁড়ে আলাদা করে মাটিচাপা দেওয়া হয় মাথা ও দেহ। পরিচয় মুছে ফেলতে মাথার চুল পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়। ঘটনাস্থলের রক্তের দাগ মুছতে পানি ঢেলে দেওয়া হয়, যেন কোনো চিহ্ন না থাকে।
কিন্তু অপরাধ যতই নিখুঁতভাবে ঢাকার চেষ্টা করা হোক, প্রকৃতি কখনো কখনো সত্যকে ফিরিয়ে আনে।
প্রায় ২০ থেকে ২১ দিন পর শিয়ালের দল মাটি খুঁড়ে দেহাংশ বের করে আনে। তখনই স্থানীয়রা বিষয়টি জানতে পারেন। পোশাক দেখে পরিবারের সদস্যরা শনাক্ত করেন কিশোরকে। উন্মোচিত হয় এক বিভীষিকাময় হত্যার চিত্র।
লাশ উদ্ধারের পর নিহত কিশোরের বাবা বাদী হয়ে সাতকানিয়া থানায় মামলা করেন। কিন্তু দীর্ঘদিনেও তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
একপর্যায়ে হতাশ হয়ে মামলাটি সিআইডিতে হস্তান্তরের আবেদন করেন তিনি। ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর আদালতের নির্দেশে সিআইডি তদন্ত শুরু করে।
তদন্তে ধাপে ধাপে উঠে আসে কিশোরের চলাফেরার তথ্য। একাধিকবার সাতকানিয়ায় গিয়ে তথ্য সংগ্রহের পর সন্দেহের তালিকায় আসে পারভেজের নাম। কারণ, কিশোরটি নিয়মিত তার অটোরিকশায় চলাফেরা করত।
অবশেষে গত বৃহস্পতিবার রাতে পারভেজকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ভেঙে পড়ে সে।
স্বীকার করে নেয় হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততা। পরদিন শুক্রবার চট্টগ্রামের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হারুনের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিদর্শক মোশারফ হোছাইন জানান, নিহত কিশোরের সঙ্গে কারা চলাফেরা করত, সেই সূত্র ধরেই তদন্ত এগোয়। এতে পারভেজের সংশ্লিষ্টতা স্পষ্ট হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে সে পুরো ঘটনার বর্ণনা দেয়।সূত্র-প্রথম আলো
সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, এটি ছিল সম্পূর্ণ ক্লুলেস একটি মামলা। তবে শেষ পর্যন্ত রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হয়েছে।
ইয়াবা ব্যবসার লাভের অংশ না পেয়ে পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। জড়িত বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে এবং দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
নিহতের বাবা শোক ও ক্ষোভে বলেন, “পারভেজের গাড়িতে করে এদিক-ওদিক যেত আমার ছেলে। আমি কখনো ভাবিনি সেই মানুষই টাকার লোভে আমার ছেলেকে মেরে ফেলবে।” তিনি এই ঘটনায় জড়িত সকল আসামির গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
চার বছর ধরে অন্ধকারে ঢাকা ছিল একটি হত্যার রহস্য। শেষ পর্যন্ত স্বীকারোক্তির মাধ্যমে সামনে এসেছে সেই বিভীষিকা—যেখানে টাকার লোভ মানুষকে পরিণত করেছে নৃশংস ঘাতকে, আর একটি পরিবারকে চিরদিনের জন্য ডুবিয়েছে শোকের গভীর খাদে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



