back to top

দারিদ্র্য জয় করে লোকসংস্কৃতিকে বিশ্বে ছড়িয়ে দেন রমেশ শীল: জাফর

প্রকাশিত: ১১ মে, ২০২৬ ০০:০১

চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে একুশে পদকপ্রাপ্ত উপমহাদেশের প্রখ্যাত কবিয়াল রমেশ শীলের ১৪৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনে লোকসংস্কৃতি, মানবিকতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক হিসেবে তাঁকে তুলে ধরা হয়েছে।

রবিবার (১০ মে) রাতে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন শাহেনশাহ্ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.) ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এ ওয়াই এমডি জাফর।

তিনি বলেন, একসময় যখন এ দেশের লোকসংস্কৃতি অবহেলার শিকার হচ্ছিল, তখন রমেশ শীল তাঁর সৃষ্টিশীলতা দিয়ে এই ধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং দেশকে উপমহাদেশে একটি অনন্য অবস্থানে নিয়ে গেছেন।

অধ্যাপক জাফর তাঁর বক্তব্যে রমেশ শীলের জীবন ও দর্শনের মানবিক দিকটি বিশেষভাবে তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, শৈশব থেকেই হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—সব ধর্মের মানুষের সঙ্গে মেলামেশার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন রমেশ শীল।

পরিবার থেকেই তিনি মানবিক মূল্যবোধ, ভালোবাসা ও সহাবস্থানের শিক্ষা পেয়েছিলেন। এই বহুত্ববাদী চেতনা তাঁর কবিগান ও শিল্পচর্চার ভিত গড়ে দেয়।

তিনি আরও বলেন, অল্প বয়সে পিতৃহীন হয়ে দারিদ্র্যের কষাঘাতে দিশেহারা হয়ে পড়েন রমেশ শীল। জীবিকার তাগিদে বার্মায় পাড়ি জমান।

তবে কয়েক বছর পর দেশে প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড়ের খবর পেয়ে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে পিতার কবিরাজি পেশা শুরু করার পাশাপাশি চালিয়ে যান কবিগানের চর্চা।

কবিগানের এক ঐতিহাসিক ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে জাফর বলেন, ১৮৯৮ সালে সদরঘাটে এক কবিতাযুদ্ধে প্রতিপক্ষের অশালীন আক্রমণের মুখে শালীনতা বজায় রেখে সারারাত লড়াই চালিয়ে যান রমেশ শীল। শেষ পর্যন্ত আপসের মাধ্যমে তাঁকে জয়ী ঘোষণা করা হয়। এই ঘটনাই তাঁর শিল্পীসত্তার দৃঢ়তা ও নৈতিক অবস্থানের প্রমাণ বহন করে।

রমেশ শীলের রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। সূর্যসেনের ১৯৩০ সালের আন্দোলন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং পরবর্তী বিভিন্ন আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহণের কথা তুলে ধরে জাফর বলেন, তিনি কেবল শিল্পীই নন, সময়সচেতন এক সমাজমানসও ছিলেন। কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ও তিনি শান্তির পক্ষে ভূমিকা রাখেন।

আলোচনা সভায় রমেশ স্মৃতি ট্রাস্টকে সার্বিক সহেযাগীতা করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে তিনি রমেশ শীলের স্মৃতি সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর সমাধিস্থলের পাশে ‘রমেশ কমপ্লেক্স’ নির্মাণের পূর্বঘোষণা বাস্তবায়ন এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ে একটি কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি স্থানীয় সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহর প্রতি অনুরোধ জানান। একই সঙ্গে রমেশ স্মৃতি ট্রাস্ট কর্মকর্তাদেরকে রমেশ শিল্পীগোষ্ঠী গঠনেরও প্রস্তাব দেন তিনি।

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রমেশ শীল স্মৃতি ট্রাস্টের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মানস চৌধুরী এবং সঞ্চালনা করেন ট্রাস্টের সদস্য শিক্ষক-সাংবাদিক প্রলয় চৌধুরী মুক্তি। স্বাগত বক্তব্য দেন ট্রাস্টের কোষাধ্যক্ষ কাজল শীল।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, “রমেশ শীল আজ থেকে ১৪৯ বছর আগে মৃত্যুবরণ করলেও তিনি আজও আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন। তিনি অমর হয়ে আছেন।

যে আধ্যাত্মিক চেতনা রমেশ শীলের মনের মধ্যে জাগ্রত ছিল, সে চেতনার মাধ্যমে তাঁর গান ও ছন্দ তিনি মানুষের জন্য রেখে গেছেন।”

তিনি আরও বলেন, বাংলার লোকসংস্কৃতি সমৃদ্ধ করতে রমেশ শীলের অবদান অনন্য। বোয়ালখালীকে তিনি তাঁর কর্মের মাধ্যমে শুধু বাংলাদেশ নয়, উপমহাদেশের মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছেন।

রমেশ কমপ্লেক্স বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খান যে জায়গাটি নির্ধারণ করেছিলেন সেটি অর্পিত সম্পত্তি হওয়ায় কিছু জটিলতা রয়েছে। তবে দায়িত্বশীলদের সঙ্গে সমন্বয় করে তা সমাধানের চেষ্টা চলছে। জটিলতা না কাটলে সরকারি খাস জমিতে কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এ সময় তিনি রমেশ শীলের নামে একটি লাইব্রেরি স্থাপনের উদ্যোগের কথাও জানান। পাশাপাশি বলেন, রমেশ শীলের কর্মকাণ্ড সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনার বিষয়ে সাংস্কৃতিক মন্ত্রী নিতাই রায়ের কাছে ট্রাস্টের পক্ষ থেকে আবেদন করার প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “গুণী মানুষের স্মৃতিকে অম্লান করা আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। রমেশ শীল মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। তিনি গণমানুষের কবি। তাঁর জন্য কিছু করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করবো।”

এছাড়া তিনি এলাকাবাসীকে রমেশ শীলের স্মৃতি সংরক্ষণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অদুল-অনিতা ট্রাস্টের চেয়ারম্যান শ্রী অদুল কান্তি চৌধুরী, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আজিজুল হক, বিএনপি নেতা শওকত আলম, ইসহাক চৌধুরী, মেহেদী হাসান সুজন, বোয়ালখালী পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি স্বপন শীল এবং বোয়ালখালী থানার ওসি মাহফুজুর রহমানসহ অনেকে।

আয়োজকেরা জানান, রমেশ শীলের জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই নিয়মিত এ ধরনের আয়োজন করা হচ্ছে।

দিনব্যাপী আলোচনা, স্মৃতিচারণ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয়।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি