back to top

আপত্তিকর অবস্থায় বান্ধবীসহ আটক, ছাত্রদলের সাংগঠনিক পদ হারান সাকিফ

প্রকাশিত: ২৫ মে, ২০২৬ ০৯:২৪

রাত তখন প্রায় ১২টা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট এলাকার পরিবেশ ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসছিল। ঠিক সেই সময় জেএম টাওয়ারসংলগ্ন একটি বাসাকে ঘিরে শুরু হয় হঠাৎ উত্তেজনা।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে খবর। চবি শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাকিফ রহমান তার বান্ধবীসহ ‘আপত্তিকর অবস্থায়’ আটক হয়েছেন।

রাত পেরোতে না পেরোতেই ঘটনাটি ক্যাম্পাসের অলিগলি থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। আর ২৪ ঘণ্টা না যেতেই সাংগঠনিক পদ হারান সাকিফ।

রোববার (২৪ মে) ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক আদেশে সাকিফ রহমানকে বহিষ্কার করা হয়।

বহিষ্কারাদেশে বলা হয়, “সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে” তাকে চবি শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কেন এমন সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত?

এদিকে ঘটনাটির একাধিক স্তর এখনো ধোঁয়াশায় ঢাকা। অভিযোগ, পাল্টা ব্যাখ্যা, দরজা ভেঙে ঢোকার দাবি, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং রাজনৈতিক শুদ্ধতার প্রশ্ন—সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এই ঘটনা।

ঘটনার পর নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন সাকিফ রহমানও। তিনি দাবি করেন, পুরো ঘটনাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘আপত্তিকর’ রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

সাকিফের ভাষ্য অনুযায়ী, তার বান্ধবী গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার জন্য সকাল ৬টার টিকিট কেটেছিলেন।

এ কারণে কয়েকজন বন্ধু মিলে রাতে ক্যাম্পাসে ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা করেন তারা। পরে রাতের খাবার শেষে স্টেশন তলা এলাকায় ঝামেলার খবর পেয়ে ২ নম্বর গেট দিয়ে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।

তার দাবি, রাত প্রায় ১২টার দিকে তিনি ব্যাগ নেওয়ার জন্য নিজের রুমে যান। তখন বান্ধবীকে নিচে একা রাখা নিরাপদ মনে হয়নি। তাই তাকেও রুমে নিয়ে যান, যেন দ্রুত গোসল করে ব্যাগ নিয়ে বের হতে পারেন।

সাকিফ বলেন,“আমরা কোনো আপত্তিকর অবস্থায় ছিলাম না। কিন্তু কিছু মানুষ দরজা ভেঙে রুমে ঢুকে পড়ে এবং ঘটনাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে।”

এই বক্তব্য নতুন করে আরেকটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত পরিসরে জোরপূর্বক প্রবেশের বৈধতা কতটুকু?

আর অভিযোগ প্রমাণের আগেই সামাজিক ও রাজনৈতিক বিচারের সংস্কৃতি কি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে?

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবশ্য এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয়নি।

চবি’র সহকারী প্রক্টর ড. মো. কামরুল হোসেন জানান, খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে যান এবং দুজনকে ক্যাম্পাস এলাকায় নিয়ে আসেন। পরে তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। ঈদের ছুটির পর বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তবে প্রশাসনিক তদন্তের আগেই ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করে দিয়েছে, সংগঠনটি এই ঘটনায় কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে ‘নৈতিক ইমেজ’ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে সংগঠনগুলো দ্রুত নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে চায়।

কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে আরেক বিতর্ক। কেউ বলছেন, এটি সাংগঠনিক শৃঙ্খলার প্রশ্ন; আবার কেউ দেখছেন ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের প্রবণতা হিসেবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছাত্ররাজনীতি নানা কারণে আলোচনায় এসেছে—ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার এবং ব্যক্তিগত জীবনকে কেন্দ্র করে সংঘাত। সাকিফ রহমানের ঘটনাটি যেন সেই দীর্ঘ বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করল।

কারণ, এখানে শুধু একজন ছাত্রনেতার বহিষ্কার নয়; বরং প্রশ্ন উঠেছে—বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একজন প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সম্পর্কের সীমা কোথায় শেষ হবে, আর সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ কোথা থেকে শুরু হবে?

ঈদের ছুটির পর প্রশাসনিক তদন্তের ফল যা-ই হোক, এরই মধ্যে চবির রাজনীতি ও শিক্ষাঙ্গনে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—মধ্যরাতের সেই ঘটনার অভিঘাত সহজে থামছে না।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি