back to top

পিকআপের এক ধাক্কায় অনাথ হলো একটি পরিবার!

কর্ণফুলীর সড়কে নিভে গেল বাবা-ছেলের জীবন

প্রকাশিত: ০২ জুন, ২০২৬ ১৩:২০

সকালটা ছিল একেবারেই সাধারণ। একজন ছেলে তার বৃদ্ধ বাবাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বাবাকে নিরাপদে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে স্কুলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়ার কথা ছিল তার।

পরিবারের কাছে এটি ছিল প্রতিদিনের মতোই একটি স্বাভাবিক যাত্রা। কিন্তু নিয়তি যেন ওত পেতে ছিল কর্ণফুলীর সড়কের এক বাঁকে।

কয়েক সেকেন্ডের ভয়াবহ সংঘর্ষে থেমে গেল দুই প্রজন্মের জীবন। পিকআপ ভ্যানের এক ধাক্কায় রক্তাক্ত সড়কে লুটিয়ে পড়লেন বৃদ্ধ বাবা দুর্গাপদ মল্লিক।

জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হাসপাতালে নেওয়া হলো ছেলে, শিক্ষক বিধান মল্লিককে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউই ফিরলেন না।

একটি পরিবারের মাথার ওপর থেকে একসঙ্গে সরে গেল ছায়া আর ভরসা। কর্ণফুলীর সড়কে নিভে গেল বাবা-ছেলের দুটি জীবন, আর রেখে গেল অসংখ্য কান্না, শোক আর অপূরণীয় শূন্যতা।

মঙ্গলবার (২ জুন) সকালে কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতুর প্রথম সিঁড়ি এলাকায় ঘটে হৃদয়বিদারক এ দুর্ঘটনা।

নিহতরা হলেন আনোয়ারা উপজেলার চাতরী ইউনিয়নের সিংহরা গ্রামের বাসিন্দা দুর্গাপদ মল্লিক (৭০) এবং তার ছেলে বিধান মল্লিক (৪৭)।

বিধান মল্লিক কর্ণফুলীর দৌলতপুর বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। তারা নগরের পাথরঘাটা এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।

যে যাত্রার শেষ গন্তব্য ছিল মৃত্যু:

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন সকালে মোটরসাইকেলে করে বাবাকে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দিতে বের হয়েছিলেন বিধান মল্লিক।

বাবাকে নামিয়ে দিয়ে তার স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল। হয়তো শিক্ষার্থীরা অপেক্ষা করছিলেন তাদের প্রিয় শিক্ষকের জন্য। হয়তো দিনের ক্লাস পরিকল্পনাও তৈরি ছিল। কিন্তু সেই অপেক্ষা আর পূরণ হলো না।

মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ আবু সাঈদ বাকের জানান, সকাল আটটার দিকে নতুন সেতু এলাকা থেকে মইজ্জ্যারটেকের দিকে যাচ্ছিল একটি পিকআপ ভ্যান ও মোটরসাইকেল।

শাহ আমানত সেতুর প্রথম সিঁড়ি এলাকায় পৌঁছালে দুটি যানবাহনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা দুর্গাপদ মল্লিক ঘটনাস্থলেই নিহত হন।

গুরুতর আহত অবস্থায় বিধান মল্লিককে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীর চোখে বিভীষিকাময় মুহূর্ত:

দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী জামাল উদ্দীন এখনও ভুলতে পারেননি সেই দৃশ্য। তিনি জানান, সেতু থেকে নামার পথে একটি পিকআপ ভ্যান মোটরসাইকেলটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। মুহূর্তেই ছিটকে পড়েন আরোহীরা।

প্রবল আঘাতে দুর্গাপদ মল্লিক পিকআপের নিচে পড়ে যান। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। চারপাশে তখন আতঙ্ক, চিৎকার আর ছুটোছুটি।

স্থানীয়রা দ্রুত আহত বিধান মল্লিককে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। কিন্তু ভাগ্য যেন সেদিন তাদের পরিবারের প্রতি নির্মমই ছিল। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনিও চলে যান না ফেরার দেশে।

একসঙ্গে নিভে গেল ছায়া ও ভরসা:

স্বজন বাবলা মল্লিকের কণ্ঠে ছিল অসহায় বেদনা। তিনি বলেন, তার ভাই বিধান মল্লিক বাবাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন। বাবাকে নামিয়ে দিয়ে তার স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পথেই ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।

একটি পরিবারের জন্য এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে? যে বাবা দীর্ঘ জীবন পেরিয়ে সন্তানের স্নেহে শেষ বয়স কাটানোর স্বপ্ন দেখছিলেন, সেই বাবাই ছেলের সঙ্গে একই দিনে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন।

আবার যে ছেলে বাবার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, তিনিও আর ফিরে আসতে পারলেন না পরিবারের কাছে।

একজন শিক্ষকের অসময়ে বিদায়:

বিধান মল্লিকের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; এটি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অসংখ্য শিক্ষার্থীরও অপূরণীয় ক্ষতি।

দৌলতপুর বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক হিসেবে তিনি বহু শিক্ষার্থীর কাছে ছিলেন জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়া একজন মানুষ।

প্রতিদিনের মতো সেদিনও তিনি দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পৌঁছানোর আগেই থেমে গেল তার জীবনযাত্রা।

একজন শিক্ষক যখন হারিয়ে যান, তখন শুধু একটি প্রাণ হারায় না; হারিয়ে যায় অসংখ্য শিক্ষার্থীর স্মৃতির অংশ, হারিয়ে যায় ভবিষ্যৎ গড়ার এক কারিগর।

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন?

কর্ণফুলীর এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ জীবিকার তাগিদে, দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনে কিংবা স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে সড়কে নামেন। কিন্তু একটি ভুল, একটি অসতর্কতা কিংবা একটি বেপরোয়া মুহূর্ত কেড়ে নিতে পারে বহু জীবনের স্বপ্ন।

সড়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কঠোর নজরদারি, যানবাহনের গতিনিয়ন্ত্রণ, চালকদের দায়িত্বশীল আচরণ এবং কার্যকর আইন প্রয়োগ ছাড়া দুর্ঘটনা কমানো কঠিন।

যে কান্না দীর্ঘদিন থামবে না:

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলাউদ্দীন তালুকদার জানান, আহত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসকরা বিধান মল্লিককে মৃত ঘোষণা করেন।

পরে দুর্ঘটনায় নিহত তার বাবা দুর্গাপদ মল্লিককেও হাসপাতালে আনা হয়। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া হয়তো চলবে তার নিজস্ব গতিতে। তদন্ত হবে, দায় নির্ধারণ হবে। তবু যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা আর কোনোদিন পূরণ হবে না।

মঙ্গলবারের সেই সকাল হয়তো অনেকের কাছেই ছিল আরেকটি সাধারণ দিন। কিন্তু মল্লিক পরিবারের জন্য সেটিই হয়ে রইল জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সকাল।

যে ছেলে বাবাকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দিতে বের হয়েছিল, সে-ই শেষ পর্যন্ত বাবার সঙ্গে চলে গেল অনন্তের পথে। আর পেছনে রেখে গেল এক পরিবারের দীর্ঘশ্বাস, স্বজনদের অশ্রু আর বুকভাঙা একটি প্রশ্ন—একটি পরিবারের এত বড় ক্ষতির দায় নেবে কে?

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি