বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পরবর্তী প্রধান কে হচ্ছেন-এ প্রশ্ন এখন শুধু প্রতিরক্ষা অঙ্গনের আলোচ্য বিষয় নয়, প্রশাসনিক মহল-নীতিনির্ধারণী পর্যায় এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলেও চলছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা।
বর্তমান নৌপ্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসানের মেয়াদ আগামী ২৩ জুলাই শেষ হওয়ার কথা। তার আগেই উত্তরসূরি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা, হিসাব-নিকাশ এবং নেপথ্যের তৎপরতা।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের তালিকায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান।
বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে তার সম্ভাব্য পদোন্নতি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সামনে চলে এসেছে তার অতীত দায়িত্ব পালনকাল ঘিরে উত্থাপিত নানা অভিযোগও।
প্রশাসনিক ও সামরিক সূত্রগুলো বলছে, নৌপ্রধান হওয়ার দৌড়ে মনিরুজ্জামানকে এগিয়ে রাখা হচ্ছে।
কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—যেসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো জনসম্মুখে স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি দেখা যায়নি, সেগুলো বিবেচনায় নিয়েই কি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক নেতৃত্বের পদে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে?
শিপিং করপোরেশনের জাহাজ ক্রয়: যে প্রশ্নের উত্তর মেলেনি
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান এস এম মনিরুজ্জামান। দায়িত্ব পালনকালে তার ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, চীনের সিএমসি থেকে জাহাজ ক্রয় প্রকল্পে বরাদ্দ ও ক্রয়সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে গুরুতর অসঙ্গতির অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২০ সালে ২৩৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের ভিত্তিতে চীনের সিএমসির কাছ থেকে ছয়টি জাহাজ সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ২০২২ সালে মনিরুজ্জামান দায়িত্ব গ্রহণের পর একই প্রকল্পে একই অর্থে চারটি জাহাজ কেনা হয়।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এই সিদ্ধান্তের ফলে বিপুল অঙ্কের অর্থের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেটিও আলোচনায় এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই ২০২৩ সালের ১৪ অক্টোবর, সরকারি ছুটির দিনে চুক্তিটি সম্পন্ন করা হয়।
তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের দাবি, ছয়টি জাহাজ কেনার বরাদ্দে চারটি জাহাজ কিনে প্রায় ৪৮৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো আদালত বা তদন্ত সংস্থার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
তবুও সংশ্লিষ্ট মহলের একটি অংশের মতে, এত বড় প্রকল্পের আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা জনস্বার্থেই প্রয়োজন।সূত্র-সু.মিশিগান
দুদকের অনুসন্ধান: কেন থেমে গেল আলোচনা?
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এস এম মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ আত্মসাৎ এবং মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করে।
২০২৫ সালের ১ জুলাই দুদক একটি অনুসন্ধান দল গঠন করে। সহকারী পরিচালক (অনুসন্ধান ও তদন্ত-৫) মো. নওশাদ আলীর নেতৃত্বে গঠিত ওই দলের অপর সদস্য ছিলেন উপসহকারী পরিচালক ইমরান আকন।
অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্যমতে, ১৯ জুলাই অনুসন্ধান দল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, এস এম মনিরুজ্জামানের ব্যক্তিগত তথ্য এবং তার পরিবারের সদস্যদের সম্পদসংক্রান্ত তথ্য তলব করে।
অভিযোগগুলোর প্রাথমিক সত্যতা যাচাইয়ের কাজও এগিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই কার্যক্রমের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি আর দেখা যায়নি।
এখানেই তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। অনুসন্ধানের পরিণতি কী হয়েছিল? অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছিল, নাকি তদন্ত অন্য কোনো কারণে স্থবির হয়ে পড়ে?
এসব প্রশ্নের আনুষ্ঠানিক উত্তর জনসম্মুখে না আসায় বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে।
প্রভাবশালী যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা
সামরিক ও প্রশাসনিক মহলের আলোচনায় আরেকটি বিষয় বারবার উঠে আসছে—প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে মনিরুজ্জামানের সম্পর্কের প্রশ্ন।
একাধিক সূত্রের দাবি, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ, তাকে নৌপ্রধান হওয়ার দৌড়ে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
সূত্রগুলোর দাবি, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামসুল ইসলামের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি এখন সামরিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত।
যদিও এ ধরনের সম্পর্ক বা যোগাযোগ নিজেই কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়, তবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে এসব বিষয় আলোচনায় চলে আসে।
প্রশাসনের একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, “সামরিক নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু দক্ষতা নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটিও জনআস্থার পরীক্ষার মুখে পড়ে। ফলে যেকোনো বিতর্ক বা অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় আসে।”
অন্যদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ, তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এক নাম
নৌপ্রধান হওয়ার সম্ভাব্য আলোচনায় রিয়ার অ্যাডমিরাল গোলাম সাদেক এবং রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ মুসার নামও রয়েছে।
তাদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে আর্থিক অনিয়ম ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।
তবে প্রশাসনিক মহলের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে এস এম মনিরুজ্জামানের নাম।
কারণ, একদিকে তিনি সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে এগিয়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বেশ কয়েকটি এখনো জনপরিসরে পুরোপুরি ব্যাখ্যাত বা নিষ্পত্তিকৃত নয়।
রিয়ার অ্যাডমিরাল গোলাম সাদেক যে কারণে আলোচনায়
২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রিয়ার অ্যাডমিরাল গোলাম সাদেকও নৌপ্রধান হওয়ার দৌড়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম।
তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ নগরবাড়ী, কাজিরহাট, নরাধহ ও নন্দীবন্দর ঘাট ইজারা-সংক্রান্ত অনিয়ম।
অভিযোগ রয়েছে, বার্ষিক ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকার ইজারা মাত্র ২ কোটি টাকায় অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে সরকারের প্রায় ৬ কোটি ৮১ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
দুদকের কমিশন সভায় তার বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দেওয়া হলেও পরে রাজনৈতিক তদবিরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে কমিশন।
অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কমিশনের অনুমোদনের পরও মামলা প্রত্যাহারের ঘটনা দুদকের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল।
গোলাম সাদেকের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, বিআইডব্লিউটিএর ৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকার ড্রেজার ও জলযান ক্রয় প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম এবং অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।
এই প্রকল্পে সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছিল দুদক।
গোলাম সাদেককেও তলব করা হয়েছিল। কিন্তু সেই অনুসন্ধানও পরে রহস্যজনকভাবে স্থবির হয়ে পড়ে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।
মুসাকে ঘিরেও প্রশ্ন
এদিকে সর্বোচ্চ নৌ নেতৃত্বের দৌড়ে থাকা সহকারী নৌপ্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ মুসার অভিযোগের ফাইলও সমানভাবে আলোচনায় রয়েছে। যদিও তার চাকরির মেয়াদ শেষ হবে ৩১ জুলাই ২০২৬।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ২০২৫ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকাকালে মুসার নিকটাত্মীয় ও বিডার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর তদবিরে তার চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়, যা নৌবাহিনীর ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে আলোচিত।
তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ, মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন ড্রেজিং ও অবকাঠামো প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, মংলা বন্দরের নথিতে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার অডিট আপত্তির তথ্যও রয়েছে।
আস্থার প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড়
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধানের পদ শুধু একটি প্রশাসনিক বা সামরিক দায়িত্ব নয়, এটি দেশের সার্বভৌম নিরাপত্তা, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক সামরিক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান।
এ কারণে নৌপ্রধান নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন আর কে এগিয়ে বা কে পিছিয়ে—সেটি নয়।
বরং প্রশ্ন হলো, যিনি এই দায়িত্বে আসবেন, তাকে ঘিরে জনআস্থা, পেশাগত গ্রহণযোগ্যতা এবং নৈতিক স্বচ্ছতা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়। আবার অভিযোগের অস্তিত্বও পুরোপুরি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
ফলে নেতৃত্বের শীর্ষে ওঠার আগে এস এম মনিরুজ্জামানকে ঘিরে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য উত্তর পাওয়ার প্রত্যাশা এখন প্রশাসনিক মহলসহ সচেতন নাগরিকদের একটি বড় অংশের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে।
তদুপরি, বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগে আলোচিত রিয়ার অ্যাডমিরাল গোলাম সাদেক এবং রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ মুসার বিষয়েও প্রয়োজনীয় তদন্ত ও যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে নৌপ্রধান নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—সচেতন মহলের প্রত্যাশা এমনই।
তবে সিদ্ধান্ত যাই হোক, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জনআস্থার প্রশ্ন এবারও যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে খুব বেশি দ্বিমত নেই।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



