back to top

মায়ের হাত ছেড়ে কয়েক কদম, তারপরই নেমে এলো শোকের কালো ছায়া

নিঝুমের মর্মান্তিক মৃত্যুর কাছে হার মানল হাওরের সৌন্দর্য

প্রকাশিত: ০৬ জুন, ২০২৬ ০৮:৩৭

টাঙ্গুয়ার হাওর। নামটি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে জল আর আকাশের এক অপার্থিব মিলনমেলা।

বিস্তীর্ণ জলরাশি, দূরের সবুজ রেখা, ভেসে চলা নৌকা আর প্রকৃতির নীরব সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে প্রতিদিন এখানে ছুটে আসেন শত শত পর্যটক।

কেউ আসেন ছবি তুলতে, কেউ প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটাতে, কেউবা পরিবার-পরিজন নিয়ে স্মৃতিময় কিছু মুহূর্ত গড়তে।

কিন্তু শুক্রবারের সেই বিকেল টাঙ্গুয়ার হাওরের সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে লিখে গেছে এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডির গল্প। যে গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আট বছরের এক নিষ্পাপ শিশু-সৌমাতা সরকার নিঝুম।

হাওরের বুকজুড়ে সেদিনও ছিল আনন্দের আয়োজন। নতুন নির্মিত ‘ভ্রমণশৈলী’ নামের হাউসবোটটির প্রথম যাত্রা।

বোটের মালিকপক্ষের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে শুরু হয়েছিল স্বপ্নময় এক ভ্রমণ। পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ঘুরে দেখে সবাই তখন সীমান্তবর্তী নিলাদ্রী লেকের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।

প্রকৃতির সৌন্দর্যে মোড়া সেই বিকেলে হয়তো নিঝুমও ছিল অন্য শিশুদের মতোই উচ্ছ্বসিত। নতুন জায়গা দেখা, হাওরের জলরাশি দেখা, পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা-এসব নিয়েই ছিল তার ছোট্ট পৃথিবী।

কিন্তু কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোর আড়ালেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে নির্মম পরিণতি।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় নিঝুম তার মা ও বোনের সঙ্গেই ছিল। হাউসবোটের পেছন দিক থেকে সামনের দিকে যাওয়ার সময় হঠাৎ অসাবধানতাবশত চলন্ত ইঞ্জিনের ওপর পড়ে যায় সে।

এরপর সবকিছু ঘটে যায় চোখের পলকে। কয়েক সেকেন্ড আগেও যে শিশুটি জীবনের আনন্দে মগ্ন ছিল, পরের মুহূর্তেই তাকে ঘিরে ধরে মৃত্যুর নির্মম ছায়া

বোটে থাকা সবাই ছুটে আসেন। দ্রুত ইঞ্জিন বন্ধ করা হয়। প্রাণপণ চেষ্টা চলে তাকে উদ্ধার করার।

কিন্তু ভাগ্য তখন আর কোনো সুযোগ দেয়নি। চলন্ত মেশিনের আঘাতে তার শরীর গুরুতরভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়। উদ্ধার করার আগেই নিভে যায় একটি কোমল প্রাণের আলো।

সেই মুহূর্তে হাওরের বিশাল জলরাশি, আকাশের সৌন্দর্য কিংবা প্রকৃতির অপার রূপ—সবকিছুই যেন অর্থহীন হয়ে পড়ে।

কারণ একটি পরিবারের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যও সন্তানের হাসির চেয়ে বড় নয়।

যে ভ্রমণ হওয়ার কথা ছিল স্মৃতি, তা হয়ে গেল শোকের নাম:
‘ভ্রমণশৈলী’ হাউসবোটটির মালিক পংকজ রায় পরে জানান, এটি ছিল তাদের হাউসবোটের প্রথম ট্রিপ। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আনন্দঘন একটি দিন কাটানোর উদ্দেশ্যেই তারা বের হয়েছিলেন।

কিন্তু প্রথম যাত্রার স্মৃতির পাতায় রঙিন ছবি নয়, জায়গা করে নিল এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা।

যে নৌযানটির নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকার কথা ছিল ভ্রমণের আনন্দ, সেই নৌযানই হয়ে উঠল এক শিশুর শেষ যাত্রার নীরব সাক্ষী।

প্রথম ট্রিপের উচ্ছ্বাস মুহূর্তেই রূপ নিল শোকে, আর আনন্দের সব শব্দ ডুবে গেল কান্নার শব্দে।

কর্মস্থলে ছিলেন বাবা, অপেক্ষায় ছিল না এমন কোনো সংবাদ:
নিঝুমের বাবা সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশে কর্মরত উপপরিদর্শক (এসআই) স্বপন চন্দ্র সরকার। সেদিন তিনি দায়িত্ব পালন করছিলেন কর্মস্থলে। তার স্ত্রী ও দুই মেয়ে আত্মীয়দের সঙ্গে হাওর ভ্রমণে গিয়েছিলেন।

একজন বাবা হিসেবে হয়তো তার প্রত্যাশা ছিল, মেয়েরা ঘুরে এসে আনন্দের গল্প শোনাবে। হয়তো ছোট্ট নিঝুম উচ্ছ্বাস নিয়ে বলবে—হাওরের জল কত বড়, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার কত উঁচু, নিলাদ্রী লেক কত সুন্দর।

কিন্তু তার কাছে পৌঁছেছিল এমন এক সংবাদ, যা কোনো বাবা কখনো শুনতে চান না। তার আদরের মেয়েটি আর বেঁচে নেই।

একটি ফোনকল, একটি খবর, একটি মুহূর্ত—আর তাতেই বদলে গেল একটি পরিবারের পুরো জীবন।

স্বপন চন্দ্র সরকারের কণ্ঠে সেই অসহনীয় শোকের প্রতিধ্বনি শোনা গেছে স্পষ্টভাবে।

“আমার স্ত্রী ও দুই মেয়ে আত্মীয়ের হাউসবোটে করে টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণে গিয়েছিল। কিন্তু দুর্ঘটনায় আমার আদরের মেয়েটিকে হারালাম। এই শোক ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।”

আসলে কিছু কষ্টের কোনো অভিধান নেই। কিছু কান্নার কোনো ভাষা হয় না।

নিঝুমের জন্য থমকে থাকা এক বিকেল:
হয়তো বাড়িতে এখনও পড়ে আছে নিঝুমের খেলনা। হয়তো তার পড়ার টেবিলে খোলা রয়েছে কোনো বই। হয়তো স্কুলব্যাগে রয়ে গেছে অসমাপ্ত কোনো খাতা।

হয়তো তার মা এখনও অবচেতন মনে খুঁজে ফেরেন মেয়ের কণ্ঠস্বর। হয়তো তার বোন এখনও বিশ্বাস করতে পারে না, যার সঙ্গে কিছুক্ষণ আগেও হাসি-আনন্দ ভাগাভাগি করছিল, সে আর কখনো ফিরে আসবে না।

আর একজন বাবা? তিনি হয়তো সারাজীবন বয়ে বেড়াবেন সেই অপূরণীয় শূন্যতা, যা কোনো সান্ত্বনা দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।

হাওরের সৌন্দর্যের আড়ালে নিরাপত্তার প্রশ্ন:
টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। প্রতিবছর হাজারো মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে আসেন। কিন্তু এই দুর্ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, পর্যটনযানে নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্ব কতটা অপরিহার্য।

বিশেষ করে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো নিরাপদ করা, চলন্ত ইঞ্জিন ও যান্ত্রিক অংশের চারপাশে পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং ভ্রমণকালে সতর্ক নজরদারি রাখা এখন সময়ের দাবি।

কারণ একটি ছোট্ট অসাবধানতাও কখনো কখনো কেড়ে নিতে পারে একটি জীবন, ধ্বংস করে দিতে পারে একটি পরিবারের সমস্ত আনন্দ।

শুক্রবারের সেই বিকেলে টাঙ্গুয়ার হাওরে সূর্য হয়তো যথারীতি অস্ত গেছে। জলরাশি হয়তো আগের মতোই ঢেউ তুলেছে। পর্যটকেরা হয়তো এখনও সেখানে গিয়ে মুগ্ধ হন প্রকৃতির সৌন্দর্যে।

কিন্তু সৌমাতা সরকার নিঝুমের পরিবারের কাছে টাঙ্গুয়ার হাওর আর কখনো শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র হয়ে থাকবে না।

সেটি হয়ে থাকবে তাদের জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতির নাম। একটি বিকেল, কয়েকটি অসতর্ক মুহূর্ত, আর তারপর এক চিরস্থায়ী শূন্যতা।

হাওরের সৌন্দর্য সেদিন হার মেনেছিল। হার মেনেছিল মানুষের সব আনন্দ, সব উচ্ছ্বাস। আর জল-আকাশের সেই অপরূপ প্রান্তরে রেখে গিয়েছিল ছোট্ট নিঝুমের অসমাপ্ত শৈশবের এক অনন্ত বেদনার গল্প।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি