কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মৌখিক নির্দেশে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসির চার স্বতন্ত্র পরিচালককে একযোগে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত রোববার পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার মাধ্যমে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে ব্যাংকটির সুশাসন ও আইনি বাধ্যবাধকতা।
নিয়মানুযায়ী পর্ষদে অন্তত দুই থেকে তিনজন স্বতন্ত্র পরিচালক থাকা বাধ্যতামূলক হলেও এই নাটকীয় বিদায়ের পর বর্তমানে রয়ে গেছেন মাত্র একজন।
অভিযোগ উঠেছে, পরিচালনা পর্ষদ থেকে স্বতন্ত্র পরিচালকদের পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে চট্টগ্রামের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ‘কেডিএস গ্রুপ’ ও এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম রহমানের হাতে ব্যাংকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তুলে দিতেই এই বেআইনি পথ বেছে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের আগস্টে পর্ষদ ভেঙে দিয়ে পাঁচজন নিরপেক্ষ ও দক্ষ স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
দায়িত্ব নিয়ে তারা দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান দিয়ে ব্যাংকের বিগত দিনের কর্মকাণ্ড নিরীক্ষা (অডিট) করান। তাতে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে আসে বলে সূত্রের দাবি।
কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর চিত্র বদলাতে শুরু করে। মালিকানায় যুক্ত চট্টগ্রামভিত্তিক দুই পক্ষের তৎপরতায় জুলাইয়ে পুরোনো ১৪ জন শেয়ারধারীকে পরিচালক পদে ফেরায় বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার সর্তে গণমাধ্যমকে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই স্বতন্ত্র পরিচালকদের নিয়োগ করেছিল। যেহেতু পুরোনো মালিকদের হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়েছে, সে কারণে আগের স্বতন্ত্র পরিচালকদের পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে।
তিনি জানান, গত ১৫ জুলাই পর্ষদে পুরোনো মালিকেরা ফেরার পর এই স্বতন্ত্র পরিচালকেরা বিভিন্ন ইস্যুতে একধরনের অস্বস্তিতে পড়েন।
বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি বছরের ১৫ জুলাই নতুন করে ১৩ জন পরিচালক নিয়োগ দেয়। এর মধ্যে পাঁচজনই চট্টগ্রামের কেডিএস গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে আল-আরাফাহ ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের ভাই আব্দুস সামাদ লাবু। নতুনভাবে যাদের যুক্ত করা হয়েছে, তাদের অনেকেই তখন পর্ষদে ছিলেন।
গত ১৫ জুলাই গঠিত পর্ষদে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হয়েছেন বদিউর রহমান। এ ছাড়া ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছেন লিয়াকত আলী চৌধুরী। আর পরিচালক হিসেবে আছেন কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান, তার ছেলে সেলিম রহমান, কেডিএস গার্মেন্টসের প্রতিনিধি পরিচালক মাহবুব আহমেদ, মোহাম্মদ আব্দুস সালাম, নাজমুল আহসান খালেদ, সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৭ আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর হয়ে নির্বাচন করা মো. এনায়েত উল্লা, আহামেদুল হক, মোহাম্মদ ইমাদুর রহমান, মো. রফিকুল ইসলাম, আনোয়ার হোসাইন ও মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ।
সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে অডিট পরিচালনাকারী স্বতন্ত্র পরিচালকদেরই সরাতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের তথাকথিত বার্তার অজুহাত তুলে তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হলো।
পদত্যাগকারী চার পরিচালক হলেন-বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক শাহীন উল ইসলাম, এনআরবি ব্যাংকের সাবেক উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল ওয়াদুদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক এম আবু ইউসুফ এবং পেশাদার চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট মোহাম্মদ আশরাফুল হাসান।
পদত্যাগকারী একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরাসরি মৌখিক নির্দেশ পাওয়ার পরই আমরা পদত্যাগপত্র জমা দিতে বাধ্য হয়েছি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তাও স্বীকার করেছেন যে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় চারজনকে সরিয়ে একজন স্বতন্ত্র পরিচালক রাখা হয়েছে। সূত্র-এদেশ-সমকাল–এডি
ব্যাংকিং খাতের বিজ্ঞজনরা বলছেন, যেখানে ব্যাংকের আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং অনিয়ম ঠেকানোর প্রধান হাতিয়ার স্বতন্ত্র পরিচালকেরা, সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই নিজের আইন ভঙ্গ করে একটি গোষ্ঠীর সুবিধার্থে তাঁদের তাড়িয়ে দিল।
অনিয়মে জর্জরিত ব্যাংকে সেলিম রহমানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হওয়ায় সাধারণ মানুষের আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


