আল-আরাফাহ ব্যাংকে ফের কেডিএস রাজত্ব, সুশাসন কি তবে নির্বাসনে?

দুদকের মামলা মাথায় নিয়ে শীর্ষ চেয়ারে!

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৯ জুলাই, ২০২৬ ২০:২০

টাকার পাহাড় আর ক্ষমতার পালাবদলের খেলায় ব্যাংকিং খাতের সুশাসন কীভাবে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে, তার এক জীবন্ত উদাহরণ তৈরি হলো আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে।

গত ১৫ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাঠানো একটি চিঠি ব্যাংকিং মহলে তুলেছে আলোচনার ঝড়। পাশাপাশি তৈরি করেছে এক চরম আতঙ্ক।

১৪ সদস্যের নতুন পরিচালনা পর্ষদে কেডিএস গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান খলিলুর রহমানসহ একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সরাসরি ৭ জন সদস্য স্থান পেয়েছেন।

একটি ব্যাংকের অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ যখন একটি মাত্র করপোরেট পরিবারের হাতে চলে যায়, তখন আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা এবং ব্যাংকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা কেবল স্বাভাবিক নয়, অনিবার্য।

এক টেবিলে সাত স্বজন: স্বার্থের সংঘাত নাকি সুশাসনের কবর?

নতুন এই পর্ষদের দিকে তাকালে চোখ কপালে ওঠার দশা হবে যেকোনো আর্থিক বিশ্লেষকের। কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান তো আছেনই, তাঁর সাথে যুক্ত হয়েছেন ছেলে সেলিম রহমান এবং ছোট ভাই আহামেদুল হক।

পারিবারিক এ বৃত্ত এখানেই শেষ নয়, এতে যুক্ত হয়েছেন আহামেদুল হকের সম্বন্ধী বদিউর রহমান। করপোরেট মোড়ক দিতে আনা হয়েছে কেডিএস গার্মেন্টসের প্রতিনিধি মাহবুব আহমেদ, কেডিএস টেক্সটাইলের প্রতিনিধি ফরিদ উদ্দিন আহমেদ এবং কেওয়াই স্টিল মিলের প্রতিনিধি শরিফ উদ্দিন তসলিমকে।

পর্ষদের প্রথম বৈঠকেই এই বলয়ের বদিউর রহমানকে চেয়ারম্যান এবং লিয়াকত আলী চৌধুরীকে ভাইস চেয়ারম্যান মনোনীত করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের স্পষ্ট মত-যখন একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর এতজন প্রতিনিধি এক টেবিলে বসেন, তখন ব্যাংকের ঋণ বিতরণ ও বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণে ‘স্বার্থের সংঘাত’ (Conflict of Interest) ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ব্যাংক তখন আর সাধারণ মানুষের আমানতের পাহাড় থাকে না, হয়ে ওঠে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিজস্ব অর্থায়নের হাতিয়ার।

দুদকের আসামী যখন ব্যাংকের সর্বোচ্চ চেয়ারে

সবচেয়ে বড় ধাক্কার জায়গাটি হলো নতুন চেয়ারম্যান বদিউর রহমানের অতীত রেকর্ড। ২০১৮ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করে।

অভিযোগ ছিল, সিঙ্গাপুরে ‘এম এস এরিয়েল মেরিটাইম প্রাইভেট লিমিটেড’ নামের সংস্থায় তিনি প্রায় ৫ লাখ সিঙ্গাপুরি ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা) পাচার ও বিনিয়োগ করেছেন, যার কোনো বৈধ উৎস তিনি দেখাতে পারেননি।

মামলাটি এখন আদালতে বিচারাধীন। আইনত দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি অপরাধী নন-এই যুক্তি খাড়া করা হলেও, প্রশ্ন ওঠে নৈতিকতার।

১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ মাথায় নিয়ে একজন ব্যক্তি কীভাবে একটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের শীর্ষ চেয়ারে বসেন? আর কেনই বা বাংলাদেশ ব্যাংক একে ‘সবুজ সংকেত’ দেয়?

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই ব্যাংকে এস আলম গ্রুপ ও কেডিএস গ্রুপের যৌথ প্রভাব নিয়ে বহু কেলেঙ্কারির খবর চাউর হয়েছিল।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক পর্ষদ ভেঙে দিয়ে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দিয়েছিল সুশাসন ফেরাতে।

কিন্তু মাত্র দুই বছরের মাথায় কী এমন ম্যাজিক হলো যে আবার সেই বিতর্কিত মুখগুলোকেই ফিরিয়ে আনা হলো?

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানের বক্তব্য এই রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে।

তিনি দাবি করেছেন, ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় আগের উদ্যোক্তাদের ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

কিন্তু যখন তাঁকে প্রশ্ন করা হলো একই গোষ্ঠীর ৭ জন থাকার বিষয়ে এবং পরিচালকদের মামলার বিষয়ে, তখন তিনি দায়সারাভাবে বলেন-বিষয়টি জানা নেই।

দেশের আর্থিক খাতের সর্বোচ্চ অভিভাবক একটি ব্যাংকের পর্ষদ অনুমোদন দেওয়ার আগে পরিচালকদের মামলার প্রোফাইল জানেন না-এই দাবি কি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য, নাকি কোনো অদৃশ্য শক্তির চাপে চোখ বন্ধ করে রাখা হয়েছে?

কেডিএস গ্রুপের এই প্রত্যাবর্তনে ব্যাংকের ভেতরে-বাইরে চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে। কারণ খলিলুর রহমান ও তাঁর ছেলে সেলিম রহমান (যিনি আগেও চেয়ারম্যান ছিলেন) এর আগের মেয়াদে ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ, নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

অস্বাভাবিক পদোন্নতি ও জালিয়াতি: সেলিম রহমানের আমলে একজন নির্দিষ্ট কর্মকর্তাকে নিয়ম ভেঙে রকেটের গতিতে একাধিক পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে ধরা পড়ে এবং ওই কর্মকর্তার চাকরি বাতিল হয়। এছাড়া জাল সনদে নিয়োগের কালো অধ্যায় তো রয়েছেই।

বেনামি ও খেলাপি ঋণ: কয়েকটি নির্দিষ্ট সংস্থায় বিশাল অংকের ঋণ অনুমোদন এবং পরবর্তীতে তা অনাদায়ী বা খেলাপি হয়ে পড়ার পেছনেও এই গোষ্ঠীর প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে।

সিএসআর ফান্ডের হরিলুট: ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) তহবিলের অর্থ দিয়ে কেনা কম্বল, ব্যাংকের নামে বিতরণ না করে কেডিএস গ্রুপের নিজস্ব ব্যানারে বিতরণ করে প্রচার নেওয়ার মতো লঘু ও গুরু-উভয় ধরণের নৈতিক স্খলনের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

তদন্তের দায় এখন কার?

পর্ষদে চট্টগ্রামভিত্তিক মীর গ্রুপের আবদুস সালাম কিংবা আল হারামাইন পারফিউমসের ইমাদুর রহমানের মতো প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা থাকলেও, ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি যে কেডিএস-এর পকেটে চলে গেছে, তা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।

বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক উন্নতির যে তত্ত্বই দিক না কেন, অতীতে যাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও আর্থিক অনিয়মের দাগ লেগেছে, তাদের হাতেই আবার ব্যাংকের চাবি তুলে দেওয়া কোনোভাবেই সুশাসনের লক্ষণ হতে পারে না। এই সিদ্ধান্ত সাধারণ আমানতকারীদের আস্থায় বড় ধরণের ফাটল ধরাবে।

দেশের ব্যাংকিং খাতকে আরেকটি বড় বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে অনতিবিলম্বে এই পর্ষদ গঠনের নেপথ্যের কারণ এবং নতুন পরিচালকদের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া জরুরি।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা কি এখন জেগে ঘুমাবে, নাকি আমানতকারীদের স্বার্থে কঠোর অ্যাকশনে যাবে-তা দেখার অপেক্ষায় পুরো দেশ।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি