বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে জিএম ও নির্বাহী প্রযোজকের হরিলুট-তদন্তে দুদক!

ভুয়া ভাউচার ও পুনঃপ্রচারে কোটি কোটি টাকা লোপাট

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০০:৫০

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) চট্টগ্রাম কেন্দ্র এখন অনিয়ম,জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহা-চরম স্বেচ্ছাচারিতা ও রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।

সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে কেন্দ্রের পুরো সম্প্রচার ব্যবস্থা।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তলব, মন্ত্রণালয়ের তদন্তে প্রমাণিত অভিযোগ এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের চাক্ষুষ প্রমাণ থাকার পরও বহাল তবিয়তে রয়েছেন অভিযুক্ত কর্মকর্তারা।

কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মো. ঈমাম হোসাইন এবং নির্বাহী প্রযোজক মো. সফির হোসাইন (ওরফে ইলন সফির) এর প্রত্যক্ষ মদদে গঠিত ‘হোসাইন সিন্ডিকেট’ এর কবলে পড়ে স্থবির হয়ে পড়েছে রাষ্ট্রীয় এই সম্প্রচার মাধ্যমটি।

শিল্পী সম্মানীর টাকা চুরি, প্রতিনিয়ত ভুয়া শিল্পী গঠন, ভুয়া পুনঃপ্রচার দেখিয়ে বাজেট উত্তোলন এবং কাল্পনিক বিল-ভাউচার তৈরির মতো গুরুতর অভিযোগ একাধিক তদন্তে প্রমাণিত হলেও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে রহস্যজনক ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রশাসনিক দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষুব্ধ শিল্পী, কলাকুশলী ও সাধারণ কর্মীরা।

গ্রাফিক্স কার্ড পুনঃপ্রচার ও ভূতের নামে ট্রাভেল বিল
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, “ইতিহাসের এই দিনে” শিরোনামের মাত্র ২ মিনিটের একটি গ্রাফিক্স কার্ড টানা ২৯ বার পুনঃপ্রচার দেখিয়ে ৩৩ লাখ টাকা বাজেট হিসেবে উত্তোলন ও আত্মসাৎ করা হয়েছে।

শুধু তা-ই নয়, ওই একই গ্রাফিক্স কার্ড সম্প্রচারের বিপরীতে কোনো বাস্তব সফর ব্যতিরেকেই ভ্রমণের অজুহাতে চার মাসে উত্তোলন করা হয়েছে ৭ লাখ ২৩ হাজার টাকা।

অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা রোমানা শারমিনকে দিনের পর দিন ছুটিতে রেখে শিল্পী সম্মানীর নাম ভাঙিয়ে ৬০ লাখ ৫৮ হাজার ৩৪৬ টাকা অনৈতিকভাবে তুলে নেওয়ার সত্যতা মিলেছে সরকারি তদন্তে।

বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্র: তদন্তে আত্মসাতের প্রমাণ, এরপরও ফাইল গায়েব ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা
বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রে জালিয়াতি, অনিয়ম ও রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হলেও রহস্যজনক কারণে থমকে আছে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা। দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনের মারাত্মক সব তথ্য প্রকাশ্যে আসার পরও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের হাত ধরে বহাল তবিয়তে রয়েছেন অভিযুক্ত কর্মকর্তারা।

মন্ত্রণালয়ের স্মারক গোপন ও আজগর আলীর তদন্ত
বিটিভির প্রধান কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শিল্পীদের কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় (স্মারক নং ১৫.০০.০০০০.০২৩.৩২.০০১.২৪-০৫) বিটিভির মহাপরিচালককে তদন্তের নির্দেশ দেয়।

প্রাথমিক পর্যায়ে এই নির্দেশ দীর্ঘদিন গোপন রাখা হলেও পরবর্তীতে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে বিটিভির মহাপরিচালক মাহবুবুল আলম তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন। পরিচালক (অনুষ্ঠান ও পরিকল্পনা) মো. আজগর আলীকে আহ্বায়ক করে গঠিত এই কমিটি দীর্ঘ তদন্ত শেষে সম্প্রতি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মাহফুজা আক্তারের সঙ্গে আঁতাত করে কেবল চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকেই ভুয়া বাজেট ও বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ১ কোটি ২৩ লাখ ১২ হাজার ৭২২ টাকা আত্মসাৎ করেছেন নির্বাহী প্রযোজক মো. সফির হোসাইন। সূত্র-জনবাণী

ফাইল গায়েব ও প্রশাসনিক অচলাবস্থা
অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর গাজীপুর এলাকার এক প্রভাবশালী ব্যক্তির নির্দেশে দীর্ঘদিন নথিটি গায়েব করে রাখা হয়। পরে বিটিভির সদর দপ্তরে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হলে মহাপরিচালক প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে পাঠান। তবে প্রতিবেদন পৌঁছানোর পরও অদৃশ্য কারণে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক শাস্তি স্থগিত রয়েছে।

ঈমাম হোসাইনের অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার
ঢাকা ও চট্টগ্রাম কেন্দ্রের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, সাবেক জিএম মাহফুজা আক্তারের পথ ধরেই বর্তমান জিএম (চলতি দায়িত্ব) মো. ঈমাম হোসাইন অনৈতিক সুবিধা হাসিলের জন্য মো. সফির হোসাইনকে নিজের ঘনিষ্ঠ করে নেন।

ঈমাম হোসাইনের বিরুদ্ধেও বিস্তর অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকা কেন্দ্রে থাকাকালে ভুয়া শিল্পীর নাম ভাঙিয়ে বাজেট উত্তোলন এবং ৪১টি মঞ্চনাটক পুনঃপ্রচার দেখিয়ে (প্রতিটির জন্য ১,১৭,০০০ টাকা) মোট ৪৭ লাখ ৯৭ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার প্রমাণ রয়েছে।

চট্টগ্রাম কেন্দ্রে “ইতিহাসের এই দিনে” শিরোনামের মাত্র ২ মিনিটের একটি গ্রাফিক্স কার্ড ২৯ বার পুনঃপ্রচার দেখিয়ে ৩৩ লাখ টাকা বাজেট হিসেবে আত্মসাৎ করা হয়।

গ্রাফিক্স কার্ড পুনঃপ্রচারের পাশাপাশি কোনো বাস্তব ভ্রমণ ব্যতিরেকেই ভ্রমণের অজুহাতে চার মাসে ৭ লাখ ২৩ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

নিয়ম ভেঙে বহাল ও রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন ঈমাম হোসাইনের:
অভিযোগ রয়েছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বড় অঙ্কের বিনিময়ে চাকরিতে যোগ দেন ঈমাম হোসাইন।

সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও ওবায়দুল কাদেরের পিএস আব্দুল মতিনের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রচ্ছায়ায় দায়িত্ব পালন করলেও, জুলাই অভ্যুত্থানের পর হঠাৎ নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেন তিনি।

সরকারি চাকরির বিধিমালা ভেঙে জেষ্ঠ্য কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে চট্টগ্রাম কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজারের (চলতি দায়িত্ব) পদ দখল করেন ঈমাম হোসাইন।

চাকরি বিধি অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা ছয় মাসের বেশি “চলতি দায়িত্বে” থাকতে পারেন না এবং দায়িত্বভাতা নিতে পারেন না। কিন্তু তিনি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে পদটি আঁকড়ে রেখে দায়িত্বভাতা ও বেতন ভোগ করছেন।

চট্টগ্রাম কেন্দ্রের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক পরিচয় বদলে নিজেকে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) সঙ্গে সম্পৃক্ত দেখিয়ে কেন্দ্র পরিচালনার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সরকারি কর্মকর্তার এমন রাজনৈতিক তোষামোদ ও আচরণ স্পষ্টত দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও কর্তৃপক্ষ কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিল্পী, কলাকুশলী, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিবর্গ।সূত্র-এস কে

এসব অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদনের বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার মো. ঈমাম হোসাইনের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পরবর্তীতে তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে কয়েকটি সংবাদ সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন রেখে বার্তা পাঠালে তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এড়াতে প্রতিবেদকের ব্যক্তিগত তথ্য ও পত্রিকার নিবন্ধন চাওয়ার পাশাপাশি মামলার হুমকি দিয়েছেন।

রাজনৈতিক পরিচয়ের খোলস বদলে সফির দুর্নীতি: ছাত্রলীগ থেকে ‘জাসাস’ রূপান্তরের কৌশল
বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজনৈতিক আনুগত্যের খোলস বদলে দুর্নীতি ও অনিয়ম ঢাকাকরণের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের রাজনৈতিক রূপ পরিবর্তন করে সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তা সিন্ডিকেট গঠন করে রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাট অব্যাহত রেখেছেন।

ছাত্রলীগ নেতার দ্রুত উত্থান ও অঢেল সম্পদ
নথি সূত্রে জানা যায়, ঢাকা লেদার টেকনোলজি ইনস্টিটিউট ছাত্রলীগের সাবেক গবেষণা সম্পাদক মো. সফির হোসাইন ২০১৫ সালের ৬ মে ‘প্রযোজক (গ্রেড-২)’ হিসেবে বিটিভিতে যোগদান করেন। বিটিভিতে যোগদানের পর থেকেই তিনি নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন।

তৎকালীন প্রযোজক ও ‘এইচডিটিভি (HDTV)’ প্রকল্পের পরিচালক মাহফুজা আক্তারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে নাম-বেনামে কোটি কোটি টাকা উত্তোলনে অংশ নেন সফির।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সূত্রমতে, বিটিভিতে চাকরির মাত্র তিন বছরের মাথায় গাজীপুরে ৬ একর জমি, বিলাসবহুল গাড়ি এবং রাজধানীর হাতিরঝিলে ২,৬০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট কেনেন তিনি। বর্তমানে তাঁর এই বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের আয়ের উৎস অনুসন্ধানে কাজ করছে দুদকের গোয়েন্দা শাখা।

বদলি আদেশ উপেক্ষা ও সাজা প্রাপ্তি
মন্ত্রণালয়ের ২০২২ সালের ২১ নভেম্বরের প্রজ্ঞাপনে সফির হোসাইনকে ‘প্রযোজক (গ্রেড-১)’ থেকে ‘নির্বাহী প্রযোজক’ পদে পদোন্নতি দিয়ে ঢাকায় পদায়ন করা হয়। কিন্তু তিনি মহাপরিচালকের পদায়ন আদেশ উপেক্ষা করে গোপনে চট্টগ্রামে অবস্থান করেন এবং মাহফুজা আক্তারের সহায়তায় ৫৫ লাখ টাকার ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করেন।

প্রশাসনিক শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে ২০২৩ সালের ২ মে অফিস আদেশের মাধ্যমে তাঁকে শাস্তি দেওয়া হয় এবং আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধারে ব্যবস্থা নেয় কর্তৃপক্ষ।

দুদকের এনফোর্সমেন্ট তলব ও নথি উদ্ধার
সাবেক জিএম মাহফুজা আক্তারের ২১ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলা ও ভুয়া ভাউচারে অর্থ লোপাটের অনুসন্ধ অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সফির হোসাইনকে (ওরফে ইলন সফির) তলব করে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম।সূত্র-এবি

তলবকালে চট্টগ্রাম কেন্দ্রের বিভিন্ন ভুয়া প্রজেক্ট, গ্রাফিক্স কার্ড পুনঃপ্রচার দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ এবং ভ্রমণ বিল জালিয়াতির প্রাথমিক নথিপত্র পর্যালোচনা করে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কিত একাধিক আলামত জব্দ করে সংস্থাটি।

হাতবদল ও নতুন সিন্ডিকেটের তাণ্ডব
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই দুর্নীতিবাজ চক্রটির হাতবদল ঘটে। চট্টগ্রাম কেন্দ্রের বর্তমান জিএম (চলতি দায়িত্ব) মো. ঈমাম হোসাইনের ছত্রচ্ছায়ায় নতুন রাজনৈতিক পরিচয় ও খোলস ধারণ করেন সফির।

সরকারি চাকরি বিধিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবৈধভাবে পদ আঁকড়ে ঈমাম-সফির সিন্ডিকেট এখন রাজনৈতিক আনুগত্য বদলে কার্যালয়ে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাশাপাশি সাম্প্রতিক ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ কেন্দ্রিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামেও ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে ব্যাপক লুটপাট চালাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এসব বিষয়ে নির্বাহী প্রযোজক মো. সফির হোসাইন (ওরফে ইলন সফির)র সাথে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে তিনি জিএম ঈমাম হোসাইনের মতই একই বক্তব্য দেন। এতেই অনেকটা পরিস্কার সিন্ডিকেট।

অভিযোগ এড়িয়ে নথিপত্র দাবি ও হুমকির কৌশল অভিযুক্তদের
বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে ১ কোটি ২৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি ও গ্রাফিক্স কার্ড পুনঃপ্রচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত জেনারেল ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মো. ঈমাম হোসাইন ও নির্বাহী প্রযোজক মো. সফির হোসাইনের সঙ্গে লিখিতভাবে যোগাযোগ করা হয়।

তবে অভিযোগের সরাসরি কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়ে উল্টো প্রতিবেদকের কাছে পত্রিকার বৈধ নিবন্ধন, নিয়োগপত্র ও আয়কর (ট্যাক্স) ফাইলের অনুলিপি দাবি করেছেন জিএম মো. ঈমাম হোসাইন ও নির্বাহী প্রযোজক মো. সফির হোসাইন।

হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় ঈমাম হোসাইন দাবি করেন, এর আগে প্রকাশিত সংবাদগুলোর বিষয়ে তিনি ইতোমধ্যে প্রেস কাউন্সিল, জাতীয় প্রেসক্লাব, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব ও পেশাজীবী সাংবাদিক সংগঠনে প্রতিবাদলিপি পাঠিয়েছেন এবং আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন। নথিপত্র নিয়ে বিটিভি কার্যালয়ে গেলে তথ্য-প্রমাণক দেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তথ্য অধিকার ও সরকারি নথির দায়বদ্ধতা: তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী বিটিভি একটি রাষ্ট্রীয় ও গণমুখী সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান। এর অভ্যন্তরীণ কেনাকাটা, বাজেট ও শিল্পী সম্মানী পাবলিক ফান্ড বা জনগণের আমানত।

সরকারি চাকরির বিধিমালা এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের তদন্ত প্রতিবেদনের জবাব দেওয়া একজন দায়িত্বরত কর্মকর্তার আইনি বাধ্যবাধকতা, যা কোনো নাগরিক বা সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত আয়কর নথি বা নিয়োগপত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়।

সংবাদপত্রের নিবন্ধন ও গণমাধ্যম আইন: কোনো সংবাদপত্রের নিবন্ধন বা প্রতিবেদকের পেশাগত বৈধতা যাচাইয়ের এখতিয়ার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের (ডিএফপি)।

সরকারি কোনো কর্মকর্তা নিজ স্বার্থসংশ্লিষ্ট তদন্ত এড়াতে বিচারকের ভূমিকা নিয়ে এ ধরনের নথিপত্র তলব করতে পারেন না, যা আইনি এখতিয়ার বহির্ভূত।

পেশাগত সুরক্ষার তোয়াক্কা: প্রেস কাউন্সিল ও সাংবাদিক সংগঠনে লিখিত প্রতিবাদ পাঠানো যেকোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির গণতান্ত্রিক অধিকার।

তবে অভ্যন্তরীণ সরকারি তদন্তে (যেখানে মহাপরিচালক গঠিত কমিটি ১ কোটি ২৩ লাখ টাকা আত্মসাতের সত্যতা পেয়েছে) প্রমাণিত তথ্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তথ্য গোপন রেখে উল্টো ব্যক্তিগত তথ্য দাবি করা স্পষ্টত অভিযোগ এড়ানোর কৌশল।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি তদন্ত রিপোর্ট, দুদকের নথিপত্র এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের অকাট্য আলামতের ওপর ভিত্তি করে সংবাদ পরিবেশন করা গণমাধ্যমের আইনি ও সাংবিধানিক অধিকার।

ব্যক্তির ওপর দায় না চাপিয়ে উত্থাপিত আর্থিক অনিয়মের দাপ্তরিক ব্যাখ্যা দেওয়াই সরকারি বিধিমালার মূল শর্ত।

শিল্পী ও রাজনীতিকদের ক্ষোভ: নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত আইনি ব্যবস্থার দাবি
বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রে চেপে বসা দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, জালিয়াতি এবং স্বজনপ্রীতির কারণে স্থানীয় শিল্পী, কলাকুশলী ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি সরকারের নীতি-নির্ধারক পর্যায়ের প্রতিনিধি ও স্থানীয় একাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কেন্দ্রটি পরিদর্শনে গিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা ও দূরভিসন্ধিমূলক আচরণের মুখোমুখি হন।

অর্থ ছাড়া মেলে না কাজের সুযোগ, স্বজনপ্রীতির অভিযোগ
সাধারণ ও পেশাদার শিল্পীদের অভিযোগ, অর্থ লেনদেন ছাড়া বর্তমানে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে কাজের কোনো সুযোগ নেই। প্রকৃত শিল্পীদের বঞ্চিত করে ভুয়া নামের তালিকা তৈরি, স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা পকেস্থ করছে একটি অসাধু সিন্ডিকেট।

সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ নষ্ট করে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার বানানো হয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

ফৌজদারি মামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই মারাত্মক জালিয়াতির ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ধারায় ফৌজদারি মামলা দায়েরের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

এনএসআই যাচাই ও নথি সচল
মন্ত্রণালয় ও বিটিভির ভেতরের প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী ইতিপূর্বে তদন্ত প্রতিবেদন ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল। তবে পরবর্তীতে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) এবং বিটিভির মহাপরিচালকের যৌথ গোয়েন্দা যাচাই শেষে ওই ফাইলগুলো পুনরায় সচল করা হয়। প্রয়োজনীয় পর্যালোচনার পর তা বর্তমানে দুদকে চূড়ান্ত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পাঠানো হয়েছে।

অভিযুক্তদের সাময়িক বরখাস্ত ও শাস্তির দাবি
এনএসআই এবং মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব বিভাগীয় অভ্যন্তরীণ তদন্ত রিপোর্টে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা ও নির্বাহী প্রযোজক সফির হোসাইনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। তা সত্ত্বেও দৃশ্যমান শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব হওয়ায় সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিল্পীদের মাঝে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার ও লাগামহীন অনিয়ম রুখতে অভিযুক্তদের অনতিবিলম্বে মূল পদ থেকে অব্যাহতি প্রদানসহ ফৌজদারি আইনে দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিল্পী, কলাকুশলী ও সচেতন মহল।

একইসঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং দুদকের সরাসরি হস্তক্ষেপে কেন্দ্রটিকে দুর্নীতিমুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি