ভারত-নেপালে মহাবিপর্যয় : বৃষ্টি-বন্যা ও ধসে ৭০ প্রাণহানি

নদীর রোষে তলিয়ে যাচ্ছে লোকালয়, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন!

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৪:২৩

হিমালয়ের পাদদেশ থেকে শুরু করে ভারতের সমতল-প্রকৃতির এক রূদ্র ও বিধ্বংসী রূপ দেখছে দুই প্রতিবেশী দেশ।

অঝোর ধারায় ভারী বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল এবং প্রাণঘাতী ভূমিধসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ভারত ও নেপালের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দুই দেশ মিলিয়ে মোট ৭০ জনের নির্মম মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, আর নিখোঁজ রয়েছেন বহু মানুষ।

প্রকৃতির এই তাণ্ডবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে হাজার হাজার মানুষ এখন ত্রাণ ও উদ্ধারের পথ চেয়ে দিন গুনছেন।

ভারতে রেকর্ড বৃষ্টি ও তাণ্ডব: ৫৬ প্রাণহানি
ভারতে পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে আশঙ্কাজনকভাবে। টানা বৃষ্টি, বন্যা ও একাধিক ভূমিধসে দেশটিতে অন্তত ৫৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ৪৬ জন। আছড়ে পড়া প্রকৃতির রোষে সম্পূর্ণ ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এক হাজারের বেশি বাড়িঘর।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক চিত্র দেখা গেছে ভারতের উত্তর প্রদেশে। ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত রাজ্যটিতে রেকর্ড ৬৬ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত নথিভুক্ত করা হয়েছে-যেখানে স্বাভাবিক সময়ে বৃষ্টির পরিমাণ থাকে মাত্র ৭ দশমিক ৬ মিলিমিটার! উত্তর প্রদেশের ত্রাণ কমিশনার হৃষিকেশ ভাস্কর যশোদ এই পরিসংখ্যান নিশ্চিত করেছেন।

পানিতে তলিয়ে যাওয়া প্লাবিত এলাকাগুলোতে জোরকদমে উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ বিতরণ চালাচ্ছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।

একই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হিসাব করে দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ জারি করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।

বিপৎসীমার ওপরে নদী: সতর্কবার্তা জারি
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ভারতের কেন্দ্রীয় পানি কমিশন (CWC) জানিয়েছে, দেশটির সাতটি প্রদেশের প্রায় ৩০টি নদী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ও গুরুতর পরিস্থিতির ইঙ্গিত মিলেছে।

বর্তমানে গঙ্গা, গণ্ডক, কোসি, বাগমতী ও নর্মদাসহ দুই দেশের বেশ কয়েকটি প্রধান নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

নদীর দুকূল ছাপিয়ে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে এক চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

নেপালে পাহাড়ি ঢল, তুষারধস ও ধ্বংসযজ্ঞ
প্রতিবেশী দেশ নেপালেও থাবা বসিয়েছে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সেখানে বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ১১ জন।

গতকাল রোববার পাহাড়ি ঢলের নতুন আশঙ্কার কথা জানিয়ে দেশজুড়ে জরুরি সতর্কবার্তা জারি করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।

নেপালের ৭৭টি জেলার মধ্যে ৪৯টিতেই পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে, যার মধ্যে অর্ধেকের বেশি জেলা রয়েছে চরম বিপজ্জনক অবস্থায়। প্রধান নদী ও উপনদীগুলোর পানি হু হু করে বাড়তে থাকায় তটস্থ নদীপাড়ের মানুষ।

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (NDRRMA) মুখপাত্র শান্তি মহাত জানান, গত মাসের ভয়াবহ ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলাকে বাড়তি সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ওই পূর্ববর্তী দুর্যোগে ১,৪৫০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল এবং এখনো নিখোঁজ হাজারো মানুষ। তবে স্বস্তির বিষয়, রাসুয়া ও নুয়াকোটকে আপাতত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রাখা হয়নি।

এদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেই হিমালয়ের বুকে এক ভিন্ন ট্র্যাজেডি ঘটেছে। উত্তরাঞ্চলীয় মানাং জেলায় ৭,১২৬ মিটার উচ্চতার হিমলুং হিমাল বেজক্যাম্পে একটি শক্তিশালী তুষারধস আঘাত হানে।

এতে বিদেশি পর্বতারোহীদের জন্য তাঁবু তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকা অন্তত ১০ জন স্থানীয় শ্রমিক বরফের নিচে চাপা পড়ে নিখোঁজ হয়েছেন।

পর্বতারোহণ-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার সময় সেখানে কোনো বিদেশি পর্বতারোহী উপস্থিত ছিলেন না।

ব্ল্যাকআউট ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন পুরো অঞ্চল
প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নেপালের মানাং, মুস্তাং, মিয়াগদি ও বাগলুং জেলা সম্পূর্ণ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে।

পানিসম্পদ ও জ্বালানিমন্ত্রী বিরাজ ভক্ত শ্রেষ্ঠ জানিয়েছেন, তীব্র খরস্রোতা রাহুগঙ্গা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে একটি ৪০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের স্থাপনা ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের টাওয়ার ধসে পড়েছে।

বিদ্যুৎ ও অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশজুড়ে টেলিকম যোগাযোগব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন যোগাযোগমন্ত্রী বিক্রম তিমিলসিনা।

প্রযুক্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার এই বিপর্যয় উদ্ধারকাজকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি