মুঠোফোনের চারদেয়ালের বন্দিদশা কাটিয়ে শিশু-কিশোরদের প্রকৃতির কাছাকাছি ফেরাতে এবং একই সাথে নগরীকে প্লাস্টিক দূষণ ও ডেঙ্গুর ছোবল থেকে রক্ষা করতে এক রূপান্তরমূলক ও অভিনব উদ্যোগ দেখা গেল চট্টগ্রামে।
প্লাস্টিক বর্জ্য জমা দিলেই মিলছে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় বিনামূল্যে প্রবেশের অনন্য সুযোগ!
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার দূরদর্শী চিন্তায় আজ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচিত হলো এই ব্যতিক্রমী কার্যক্রম।
একই দিন চিড়িয়াখানা প্রাঙ্গণ ও সংলগ্ন পাহাড়ি ছড়ায় ব্যাপক পরিচ্ছন্নতা ও মশকনিধন কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়।
একটি জনসচেতনতামূলক বর্ণাঢ্য র্যালির মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এ আয়োজনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং ইপসা ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট এন্টারপ্রাইজ।
সাধারণত চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় প্রবেশের জন্য টিকিটের মূল্য ৭০ টাকা। তবে নতুন এ উদ্যোগের আওতায় ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা মাত্র ১০০ গ্রাম প্লাস্টিক বর্জ্য জমা দিয়েই অনায়াসে পেতে পারছে ফ্রি এন্ট্রি!
শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংগৃহীত এই বর্জ্য পরিবেশবান্ধব উপায়ে পুনর্ব্যবহার (Recycle) করার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন ও ইপসা ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট এন্টারপ্রাইজের মধ্যে ইতিমধ্যেই এক সমঝোতা স্মারক (MoU) সই হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, শিশু-কিশোরদের মনে শৈশব থেকেই পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতেই আমাদের এই আয়োজন। এর মাধ্যমে তারা যেমন ঘরের ভেতরের ডিজিটাল পর্দার সীমানা পেরিয়ে প্রকৃতি ও প্রাণিজগতের সান্নিধ্যে আসতে পারবে, তেমনি পরিবেশ রক্ষা করা শিখবে।
একই সাথে তিনি চিড়িয়াখানায় নতুন আকর্ষণ হিসেবে জেব্রা ও কুমির আনার পরিকল্পনার কথাও সবিশেষ জানান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ড. শাহাদাত হোসেন।
পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগর গঠনে সমন্বিত প্রয়াসের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “একক কোনো সংস্থার পক্ষে আস্ত এক মহানগরী পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব নয়।
জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন এবং সর্বস্তরের নাগরিকদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে।
তিনি ফয়’স লেকসংলগ্ন চিড়িয়াখানা, পাহাড়ি ছড়া ও প্রাকৃতিক জলাধারগুলোকে যেকোনো মূল্যে দূষণমুক্ত রাখার আহ্বান জানান।
পাশাপাশি ফুটপাত ও সড়ক চলাচলের উপযোগী রাখতে সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের যৌথ অভিযানের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিনি নাগরিকদের সচেতন হওয়ার পরম তাগিদ দিয়ে বলেন, বাড়ির ছাদ, বারান্দা বা আঙিনায় যেন পানি জমতে না পারে। প্লাস্টিকের পাত্র, বোতল ও ডাবের খোসা যত্রতত্র ফেলা বন্ধ করতে হবে।
ড. শাহাদাত হোসেন আরও জানান, নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক করতে দ্রুতই জাপান থেকে ২০টি কমপ্যাক্টর ডাম্প ট্রাক চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বহরে যুক্ত করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক নানা পরিবেশবান্ধব অভিযানের খতিয়ান তুলে ধরেন জেলা প্রশাসক। তিনি জানান, গত ২৫ জুলাইয়ের অভিযানে প্রায় ৬ হাজার ২০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ২ হাজার ২৯৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে ৩ হাজারের বেশি সরকারি ভবন ও প্রতিষ্ঠানের প্রায় এক কোটি বর্গফুট এলাকা থেকে রেকর্ড ১৩৫ টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়।
পরবর্তীতে কাজীবাড়ি পুকুর, ঐতিহ্যবাহী পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত ও জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্সেও বিশাল পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হয়।
এ ছাড়া জেলার প্রায় দুই হাজার মসজিদে সচেতনতা সৃষ্টি এবং প্রায় ১০০ হোটেল-রেস্তোরাঁর রান্নাঘর পরিষ্কারসহ উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জোরদার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সম্মানিত অতিথিবৃন্দ চিড়িয়াখানা প্রাঙ্গণ এবং এর কোলঘেঁষে থাকা পাহাড়ি ছড়ার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সরজমিনে ঘুরে দেখেন।
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন শামীম মোহাম্মদ খান (সি), পিসিএসসি, বিএন এবং জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ শরীফ উদ্দিন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মোঃ কামরুজ্জামান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকতসহ জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত থেকে উদ্যোগটির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ও সংহতি ব্যক্ত করেন।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


