চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৪৭ বছরের পুরোনো খেলার মাঠটি দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে একটি অসাধূ চক্র।
অভিযোগ উঠেছে, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, ভূমি অফিস ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজসে সরকারি এই সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে।
গেল কয়েকদিন ধরেই বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ ঝারতে দেখা গেছে স্কুলটির শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অভিভাবকসহ স্থানীয় সচেতন মহলকে। তবে কাদের মাধ্যমে স্কুলের এই সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে সে বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা দেখা দিয়েছে।
এবার প্রাচীনতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির খেলার মাঠের জমি বেচাকেনার অভিযোগ পেয়ে বিদ্যালয়ে হাজির হন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর স্পেশাল টিম।
আজ রবিবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর সহকারী পরিচালক সায়েদ আলমের নেতৃত্বে আভিযানিক দল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসেন।
উইকিপিডিয়া সূত্রে জানা গেছে, উনিশ শতকের ব্রাহ্ম আন্দোলনের অন্যতম নেতা অন্নদাচরণ খাস্তগীর ১৮৭৮ সালে চট্টগ্রামের বর্তমান জামাল খান সড়কে একটি ভার্নাকুলার মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
এরপর অন্নদাচরণের জামাতা, চট্টগ্রামের সামাজিক আন্দোলনের পথিকৃৎ যাত্রামোহন সেন তার স্মৃতি রক্ষার জন্যে একে ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীত করার লক্ষে একটি বিদ্যালয় নির্মাণ করেন।
বিংশ শতকের শুরুর দিকে ১৯০৭ সালে তিনি এই বিদ্যালয়কে জমি ও ভবন দান করেন এবং নাম দেওয়া হয় অন্নদাচরণ খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।
একই বছর, এটি সরকারী বিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণা করা হয়। যিনি ডঃ খাস্তগীরের তৃতীয় কন্যা বিনোদিনীকে বিয়ে করেছিলেন, ১৯০৭ সালে এই স্কুলটি এককভাবে মেয়েদের জন্য তৈরি করেছিলেন এবং এটি নামকরণ করেন খাস্তগীর বালিকা বিদ্যালয়।
প্রতি বছর পাবলিক পরীক্ষায় ফলাফলে শীর্ষ থাকা চট্টগ্রামের প্রাচীনতম এবং অন্যতম প্রথম বালিকা বিদ্যালয়টি ২০২৪ সালে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারসহ দেশ বরেণ্য শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। ক্লাস বিরতিতে স্কুলটির সেই পুরোনো মাঠে তাদের পদচারণা ছিল হরহামেশা।
তবে সম্প্রতি ১৪৭ বছরের পুরোনো খেলার মাঠ দখলের পাঁয়তারা চলছে। প্রায় শতকোটি টাকার সাড়ে ১৫ কাঠা আয়তনের এই মাঠ ২০০৬ সালে মাত্র ৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় বিক্রি দেখানো হলেও সম্প্রতি নামজারির জন্য আবেদন করা হলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
ভূমি অফিসসহ একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের ১৫ কাঠা জমির খেলার মাঠটি ২০০৬ সালে একটি পক্ষ মাত্র ৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় ক্রয় করে।
তবে মাঠটি স্কুলের জায়গা, স্কুলের বাউন্ডারির ভেতরে এবং এ মাঠে স্কুলের শিক্ষার্থীরা সারা বছর খেলাধুলা করে উল্লেখ করে মাঠ নিয়ে মামলা করেন স্কুল কর্তৃপক্ষ।
মামলা চলাকালীন সমপ্রতি অপর পক্ষ (যারা মাঠটি ক্রয় করেছেন) স্কুলের মাঠটি তাদের নামে নামজারির জন্য ভূমি অফিসে আবেদন করলে বিষয়টি সকলের নজরে আসে। এরপর বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রামের সর্বমহলে তুমুল বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
বাকলিয়া ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, স্কুলের মাঠটি নিজের পক্ষে নামজারির জন্য ওই পক্ষটি এর আগেও চারবার আবেদন করেছিল; ভূমি অফিস চারবারই খারিজ করে দিয়েছে।
এই ব্যাপারে বাকলিয়া সার্কেল ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাসুমা আক্তার কণা গণমাধ্যমকে বলেন, ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠের ব্যাপারে মামলা চলছে।
মামলা চলাকালীন নামজারি হবে না। তারা এরআগেও চারবার নামজারির জন্য আবেদন করেছিল। চারবারই খারিজ করা হয়েছিল। এবারও খারিজ করে দিব।
ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহেদা আক্তার বলেন, মাঠটি বর্তমানে স্কুলের ভোগ দখলে রয়েছে। আমরা প্রশাসনের সহায়তা পাচ্ছি। বিষয়টি সম্পর্কে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক অবগত আছেন।
দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর সহকারী পরিচালক সায়েদ আলম বলেন, ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের জায়গা ক্রয়-বিক্রয়ে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাগজপত্র যাচাই-বাচাই করা হয়েছে। সাব-রেজিস্ট্রার অফিসেও যাবে আভিযানিক দল।



