‘ঝড়ে বক মরে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে’ অনুমান-আন্দাজে কোনো কথা বলার পর তা বাস্তব হয়ে উঠলে অনেকে বাহাদুরি ফলান।
দাবি করেন, তার কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলেছে। কথার যৌক্তিকতা নিয়ে নানা যুক্তি তুলে ধরলেও সেই যুক্তি কতক ভিত্তিহীন আর কিছুটা প্রমাণ শূন্য।
আজ ভয়াবহ ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, নরসিংদীতে উৎপত্তি হওয়া কম্পনটির ঢাকায় মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭।
তবে এই ভূমিকম্পের পরই পূর্বাভাস নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিছু ফেসবুক পেজে দেওয়া ‘পূর্বাভাস’ আছে আলোচনায়। এর প্রক্রিয়া আদৌ সম্ভব কি না, এ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে এখন।
বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন কানাডার বসবাসরত আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল পলাশ। তিনি তার ফেসবুক পাতায় বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘গতকাল মায়ানমারে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর থেকে ভূমিকম্প নিয়ে ফেসবুকে অনেক অপ-তথ্য প্রচারিত হচ্ছে। অনেকেই ম্যাসেজ দিয়ে জানতে চেয়েছেন প্রচারিত তথ্যগুলো সত্য নাকি মিথ্যা।
আপনারা আমাকে আবহাওয়া-বিদ হিসাবে চিনলেও আপনাদের বলি যে ভূমিকম্প বিষয়েও আমার একাডেমিক পড়া-লেখা রয়েছে।
জাতিসংঘের বৃত্তি নিয়ে ইতালিতে অবস্থিত ICTP: International Centre for Theoretical Physics থেকে ভূমিকম্প বিজ্ঞান বিষয়ে পড়া-লেখা করেছি।
আমার একাডেমিক পড়ালেখার আলোকে আপনাদেরকে নিশ্চিত করে বলতে চাই ভূমিকম্প সংগঠিত হওয়ার নির্দিষ্ট সময় ও স্থান বিষয়ে নির্দিষ্ট করে পূর্বাভাস করা যায় না যেমন পূর্বাভাস করা যায় আবহাওয়া সম্পর্কিত বিষয় যেমন ঘূর্ণিঝড় নিয়ে।’
তিনি জানান, ভূমিকম্পের কোনো পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়, ‘বাংলাদেশে কোন দিনে বা কোন বছরে একটি বড় ভূমিকম্প সংগঠিত হবে তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব না। যেহেতু বড়-বড় ভূমিকম্পগুলো সংগঠিত হয়ে পৃথিবীর নির্দিষ্ট কিছু স্থানে তাই ভূ-বিজ্ঞানীরা জানেন কোন স্থানে বড় ভূমিকম্প হওয়ার ঝুঁকি কেমন পরিমাণে।
ভূমিকম্প বিষয়ে গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে ভূ-বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত যে বাংলাদেশ সবসময়ই বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে।
বাংলাদেশের ২ দিকে (পূর্ব দিকে বাংলাদেশ, মায়ানমার ও ভারত সীমান্তে ও উত্তর দিকে বাংলাদেশ ও ভারতের মেঘালয় সীমান্তে) যে কোন সময় ৭ থেকে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে।’
যেসব ফেসবুক পেজে পূর্বাভাস দেওয়া হয়, সেসব খবরও গুজব বলেই উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। ‘ফেসবুকে যে পেজ গুলো তথ্য ছড়াচ্ছে বা সব সময় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেয় যে আগামী ৭২ ঘণ্টার এই স্থানে, ঐ স্থানে বড় ভূমিকম্প হবে সেই সকল তথ্যের কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাই।
তুরস্কে ভূমিকম্পের পড়ে জনৈক ব্যক্তি কর্তৃক গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের উপর ভিত্তি করে ভূমিকম্পের পূর্বাভাসের যে সংবাদ ভাইরাল হয়েছে তার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাই।
ভূমিকম্প বিষয়ে শিক্ষা দেয় এমন সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকম্প বিজ্ঞানী ও ভূমিকম্প গবেষকরা গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের উপর ভিত্তি করে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়ার কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পায় নি।’
শেষ দিকে তিনি সবাইকে সতর্ক করে দেন এই বিষয়ে। তিনি বলেন, ‘পরিশেষে, আপনাদের প্রতি বিনীত অনুরোধ গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের উপর ভিত্তি করে ভূমিকম্পের পূর্বাভাসের কোন সংবাদ নিজেদের ফেসবুক ওয়ালে শেয়ার না দেওয়ার জন্য।
এই ধরনের মিথ্যা ও মনগড়া তথ্যের প্রচার ভূমিকম্প বিষয়ে মানুষের মধ্যে অনেক কু-সংস্কার তৈরি করবে ও প্রকৃত ভূ-বিজ্ঞানীদের প্রতি অবিশ্বাস সৃষ্টি করবে।
ফলে, আপনাদের পরিণতি হতে পারে ইশপের গল্পে বর্ণিত মিথ্যাবাদী রাখাল বালকের মতো। যখন প্রকৃত ভূমিকম্পের ঝুঁকির তথ্য পাওয়া যাবে যা মানুষ বিশ্বাস করতে চাইবে না।’



