চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পালন করছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা।
আজ বুধবার (০৪ ফেব্রুয়ারি) টানা পঞ্চম দিনের মতো এমন কর্মসূচিতে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত বন্দরটি।
যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তা এখন শুধু বন্দর চত্বরে সীমাবদ্ধ নেই; দ্রুতই পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ছে এবং এর প্রভাবে জাতীয় অর্থনীতির নানা খাতে ব্যাঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভোগ্যপণ্যবাহী অনেক কন্টেইনার আটকে পড়ায় আসন্ন রমজানের আগে বাজারে পণ্য সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
অর্থনীতির ‘হৃৎপিণ্ড’ একপ্রকার থমকে থাকায় প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের বৃহৎ ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জসহ চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারগুলোতেও। আমদানি পণ্য সরবরাহ কমে গেছে, যা পণ্যের দাম বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করেছে।
এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরাও উদ্বিগ্ন। তারা মনে করছেন, সামনে রমজান থাকায় পণ্য আমদানির যে গতি থাকার কথা ছিল, তা ব্যাহত হওয়ায় বাজারে সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রমজান শুরু হতে আর ১৭ দিনেরও কম সময় বাকি থাকায় ব্যবসায়ী নেতারা আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, “দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে সামান্য সময়ের বিঘ্নও জাতীয় অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে।
ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এনসিটি ইস্যুতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর অনড় অবস্থানের কারণে এই সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
যদিও বন্দর কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।
বুধবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দর ও আশেপাশের এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পঞ্চম দিনের মতো চলা এই কর্মসূচিতে দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরের পণ্য আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
বন্দরে কনটেইনার ও পণ্য পরিবহনকারী যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ রেখে বিভিন্ন সেবা ডেস্কে কর্মবিরতির নোটিশ ঝুলিয়ে দেন শ্রমিক-কর্মচারীরা।
টার্মিনালগুলো অস্বাভাবিকভাবে নীরব। গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে আছে।
কর্মবিরতির প্রভাবে বন্দরের বিভিন্ন জেটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার ও সাধারণ পণ্য ওঠানামার সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
অপরদিকে দেখা গেছে সিএমপির নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর ব্যানারে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, গত দুই দশকে এমন চিত্র দেখা যায়নি।
এদিকে অচলাবস্থা নিরসনে দুদিন আগেই নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।
চিঠিতে বিজিএমইএ (ভারপ্রাপ্ত) সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, তৈরি পোশাক খাতের আমদানি-রপ্তানিকারকগণ চট্টগ্রাম বন্দরের সর্ববৃহৎ ব্যবহারকারী।
পোশাক খাতের কাঁচামাল আমদানি ও তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য রপ্তানি এ বন্দরের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান (ডিপি ওয়ার্ল্ড)-কে ইজারা প্রদানের বিষয়কে কেন্দ্র করে শ্রমিক-কর্মচারী সংগঠনগুলোর আন্দোলন ও কর্মবিরতির ফলে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তা গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ ধরনের কর্মসূচির কারণে বন্দরে জাহাজ হ্যান্ডলিং, কনটেইনার ওঠানামা এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বিঘ্ন ঘটছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত-তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর, যার ফলে কাঁচামাল আমদানি ও প্রস্তুত পণ্য রপ্তানি উভয় প্রক্রিয়াই ব্যাহত হচ্ছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বন্দরের যেকোনো কিছু এক মিনিটের জন্য বন্ধ করা মানেই তো পুরো দেশের ক্ষতি হওয়া। দাবিদাওয়া তো থাকতেই পারে।
কিন্তু কাজ বন্ধ করে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করে, গার্মেন্টসের ক্ষতি করে এমন দাবিদাওয়া করে কোনো লাভ নেই। সব কাজ চালু রেখে কীভাবে দাবিদাওয়া আদায় করা যায় সেগুলো নিয়ে কথা বলতে হবে, দরকষাকষি করতে হবে।
বিজিএমইএর পরিচালক কাজী মিজানুর রহমান বলেন, এ কর্মবিরতি আমদানি-রপ্তানি ও অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের। আমদানি রপ্তানি ব্যাহত হলে দেশের অর্থনীতি খারাপের দিকে চলে যাবে। এ বিষয়ে দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।
কাজ বন্ধ থাকায় বন্দরে কনটেইনার জট বাড়ছে, আমদানি পণ্য ছাড়ে গতি কমেছে। সামনেই রমজান মাস, যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে চাপ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুকের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য : মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খোকন এই অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ঘোষণা দেন।


