back to top

চট্টগ্রামে প্রকাশ্য শক্তি প্রদর্শন, ডেঞ্জার গ্যাংয়ের বেপরোয়া উত্থান!

অস্ত্র নিয়ে শক্তির মহড়া-কী ভাবছেন বিশেষজ্ঞরা?

প্রকাশিত: ০৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১৩:৫৭

বিশেষ প্রতিবেদন : চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী থানা এলাকায় আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি। গতকাল শুক্রবার বিকেলে খাস্তগীর স্কুলের গেটের সামনে প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে শক্তির মহড়া দেয় ‘ডেঞ্জার’ নামের একটি কিশোর গ্যাং

জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় এমন বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে একদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, অন্যদিকে কিশোরদের অস্ত্রের মজুদ দেখে চমকে গেছে পুলিশও।

অবশ্য খবর পাওয়া মাত্র কোতোয়ালি থানা পুলিশের বিশেষ টিম তাৎক্ষনিক অভিযান চালিয়ে গ্রুপটির ১১ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।

গ্রেপ্তার হওয়া গ্যাং সদস্যরা হলো—শামিম (২২), মো. আরমান হোসেন (১৯), মো. বাপ্পী (১৯), নাছির উদ্দিন রিয়াদ (১৯), মো. সাইম হোসেন সোহাগ (১৯), মো. হোসেন (২৩), মো. আল আমিন (১৯), মো. রিয়াদ (১৯), মো. তামজিদ (১৯), মো. অনিক আকরাম (১৯) ও নিরব গাঙ্গুলী (১৯)।

তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় একটি টিপছোরা, একটি কিরিচ, একটি চাপাতি, আটটি লাঠি, ১৫ পিস ইটের টুকরা ও একটি লোহার ধামা। যা তাদের সংঘবদ্ধ সহিংসতার প্রস্তুতির স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।

তবে ঘটনাটি সাম্প্রতিক সময়ে নগর জীবনের এক উদ্বেগজনক বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

সংগঠিত কিশোর অপরাধের নতুন চেহারা শামীম:
পুলিশ জানায়, এই গ্যাংটির নেতৃত্বে রয়েছে শামিম (২২)। তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ডেঞ্জার’ গ্রুপটি মূলত কিশোর-তরুণদের নিয়ে সংগঠিত হলেও তাদের কার্যক্রম ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত ও সংঘবদ্ধ। স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার, ভয় দেখানো এবং এলাকা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যেই তারা এমন মহড়া দেয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বেপরোয়া গ্যাং-জননিরাপত্তার জন্য হুমকি:
খাস্তগীর স্কুলের মতো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রেস ক্লাব-জামালখানের মতো সংবেদনশীল এলাকায় এমন প্রকাশ্য শক্তি প্রদর্শন জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এমন কর্মকাণ্ড জননিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ঘটনার সময় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং যান চলাচলও বিঘ্নিত হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, নগরের ব্যস্ত এলাকায় দিনের আলোতে এমন ঘটনা প্রমাণ করে, কিশোর গ্যাং সদস্যরা নিজেদের কার্যক্রম নিয়ে আগের চেয়ে বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের গ্যাং সংস্কৃতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে তা বড় অপরাধচক্রে রূপ নিতে পারে। তারা মনে করছেন ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; বরং নগরজুড়ে ক্রমবর্ধমান কিশোর গ্যাং প্রবণতার একটি প্রতিফলন।

বিশেষ করে স্কুল-কলেজ ঘিরে বা আবাসিক এলাকাগুলোতে ছোট ছোট গ্রুপ গড়ে ওঠার প্রবণতা গত কয়েক বছরে বেড়েছে।

এসব গোষ্ঠীর সদস্যরা সাধারণত কিশোর বা সদ্য তরুণ বয়সী, যাদের অনেকেই পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন কিংবা সামাজিকভাবে অরক্ষিত পরিবেশে বেড়ে উঠছে।

তাদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, পরিচিতি পাওয়া বা ‘ভয় দেখানোর ক্ষমতা’ অর্জনের প্রবণতা থেকেই এমন গ্যাং সংস্কৃতির বিস্তার ঘটছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

দ্রুত বিচার আইনে মামলা: কঠোর বার্তা পুলিশের:
এ বিষয়ে কোতোয়ালী থানার ওসি মো. আফতাব উদ্দিন জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের এই পদক্ষেপকে কিশোর গ্যাং দমনে কঠোর বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই তৎপরতা তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সহায়ক হলেও, দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

কেন বাড়ছে কিশোর গ্যাং?
এ বিষয়ে দৈনিক চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিনের সম্পাদক অ্যাডভোকেট প্রকৃতি চৌধুরী ছোটনের সাথে কথা হলে তিনি প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, সামাজিক অবক্ষয়, বেকারত্ব, পারিবারিক অবহেলা এবং অনলাইন প্রভাব—সব মিলিয়ে কিশোরদের একটি অংশ অপরাধের দিকে ঝুঁকছে।

অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়াও এই গ্যাংগুলোর টিকে থাকার পেছনে ভূমিকা রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। এই বাস্তবতায় শুধু আইন প্রয়োগ নয়, প্রতিরোধমূলক উদ্যোগও জরুরি হয়ে উঠেছে।

তিনি মনে করেন, সময়মতো কঠোর ব্যবস্থা ও সচেতনতা না বাড়ালে ভবিষ্যতে এই সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।একই সঙ্গে কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার, কিশোরদের জন্য কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনমূলক কর্মসূচি চালু করাও গুরুত্বপূর্ণ।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি