রাতের ঘুম ভাঙেনি এখনও। পাঁচ বছরের শিশুটি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিল মায়ের ঘরে। হয়তো স্বপ্ন দেখছিল—সকাল হলে মায়ের ডাক শুনে উঠবে, খেলবে, হয়তো বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলবে।
কিন্তু সেই সকাল আর আগের মতো আসেনি। ঘুম ভাঙার পর সে বুঝতে পারেনি, কী হারিয়ে গেছে। শুধু দেখেছে—মা নেই। ছোট ভাইটিও নেই। ঘরের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা।
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ময়নামতি ইউনিয়নের কালাকচুয়া ডাকলাপাড়া গ্রামে গত ৯ এপ্রিল রাতের সেই ঘটনাটি সবচেয়ে গভীর আঘাত হেনেছে এই দুই শিশুর জীবনে।
অভিযোগ অনুযায়ী, গভীর রাতে তাদের মা বাড়ি ছেড়ে চলে যান। সঙ্গে নিয়ে যান ছোট, দুই বছরের শিশুটিকে। আর বড় ছেলেটিকে রেখে যান ঘুমন্ত অবস্থায়।
পরদিন সকালে বড় শিশুটি যখন জেগে ওঠে, তখন তার পৃথিবীটা যেন হঠাৎ বদলে গেছে। মায়ের কোনো সাড়া নেই, পরিচিত কোলটি নেই। হয়তো সে বুঝে উঠতে পারেনি—এটা কি সাময়িক, নাকি স্থায়ী।
অন্যদিকে, ছোট শিশুটি—যে মায়ের সঙ্গে ঘর ছেড়েছিল—সেও বেশিক্ষণ মায়ের কাছে থাকেনি। পরে তাকে আত্মীয়দের মাধ্যমে বাবার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে সে-ও হারিয়েছে তার স্বাভাবিক আশ্রয়।
এখন দুই ভাই দুই জায়গায়। বড়টি দাদির কাছে, ছোটটি নানার বাড়িতে। একই রক্ত, একই মা—তবুও আলাদা তাদের দিন-রাত, আলাদা তাদের কান্না।
পরিবারের অভিযোগ, ২০১৯ সালে সৌদি আরবপ্রবাসী ওমর ফারুকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন জান্নাতুল ফেরদৌস। সংসারে জন্ম নেয় দুই ছেলে। প্রবাসে থেকেও স্বামী নিয়মিত অর্থ পাঠাতেন, পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করতেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মোবাইল ফোনের পর্দায় শুরু হয় এক নতুন যোগাযোগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকের মাধ্যমে চান্দিনা উপজেলার এক যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয় জান্নাতুল ফেরদৌসের। সেই পরিচয় ধীরে ধীরে গড়ায় ঘনিষ্ঠতায়—অভিযোগ পরিবারের।
গত ৯ এপ্রিল গভীর রাতে, পরিবারের সদস্যরা যখন ঘুমে, তখনই বাড়ি ছাড়েন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, সঙ্গে নিয়ে যান স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থ। তবে সবচেয়ে বেশি নাড়িয়ে দেয় যে বিষয়টি—পাঁচ বছরের বড় ছেলেকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে, দুই বছরের ছোট সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে চলে যাওয়া।
পরদিন সকালে পরিবার বুঝতে পারে—এটি শুধু কারও অনুপস্থিতি নয়, বরং একটি ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের শুরু।
পরে আত্মীয়দের মাধ্যমে ছোট শিশুটিকে বাবার পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো হয়। বর্তমানে বড় সন্তান দাদির কাছে, আর ছোটটি নানার বাড়িতে রয়েছে। দুই শিশুই এখন আলাদা দুই আশ্রয়ে, এক অনিশ্চিত বাস্তবতায়।
প্রবাসে থাকা বাবা ওমর ফারুকের কণ্ঠে শোনা যায় অসহায়ত্ব—বলেন, “আমি নিয়মিত সংসারের খরচ পাঠিয়েছি। চাওয়া মাত্রই সব দিয়েছি। কিন্তু এমন কাজ সে কীভাবে করতে পারল?
“আমার ছেলেরা আজ মা ছাড়া। আমি দূরে বসে কিছুই করতে পারছি না…”
শিশুদের এই মানসিক অবস্থার কোনো পরিমাপ নেই। তারা হয়তো এখনও পুরোটা বুঝে ওঠেনি। কিন্তু মায়ের অনুপস্থিতি, হঠাৎ বদলে যাওয়া পরিবেশ—সব মিলিয়ে তাদের শৈশবে তৈরি হচ্ছে এক নীরব শূন্যতা।
এ বিষয়ে বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লুৎফর রহমান বলেন, এ ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় মুরব্বিগণ মনে করেন, বড়রা যখন সিদ্ধান্ত নেয়, তার প্রভাব পড়ে সবচেয়ে ছোটদের ওপর। এই দুই শিশুর মতো অনেকেই হয়তো শব্দে বলতে পারে না তাদের কষ্ট—কিন্তু তাদের নীরবতা অনেক কিছু বলে।
এক রাতেই তারা শিখে গেল—সব ঘুম ভাঙা সকাল এক রকম হয় না।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



