দেশের অবক্ষয়িত বনভূমি পুনরুদ্ধার, পাহাড় রক্ষা এবং বননির্ভর জনগোষ্ঠীর বিকল্প জীবিকা তৈরির স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে শুরু হয়েছিল ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ‘টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল)’ প্রকল্প।
কাগজে-কলমে এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল পরিবেশ সংরক্ষণ ও সবুজায়নের নতুন দিগন্ত তৈরি করা। কিন্তু কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগে গিয়ে দেখা গেছে উল্টো চিত্র।
যেখানে বন হওয়ার কথা ছিল, সেখানে পড়ে আছে খালি পাহাড়। যেখানে থাকার কথা হাজার হাজার গাছ, সেখানে জন্মেছে শুধু আগাছা।
এই প্রকল্প ঘিরে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মারুফ হোসেনের বিরুদ্ধে উঠেছে ভয়াবহ অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, বদলি বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির অভিযোগ।
বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষ্য, “সুফল” প্রকল্প এখন অনেকের কাছে “লুটপাট প্রকল্পে” পরিণত হয়েছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগে সুফল প্রকল্পের আওতায় ৮ হাজার ৪৬৮ একর বনায়ন করা হয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে বাঘখালী, জোয়ারিয়ানালা, ইদগড়, ঈদগাঁও ও মেহেরঘোনাসহ বিভিন্ন রেঞ্জ ঘুরে দেখা গেছে, বনায়নের সেই দাবি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ।
বাঘখালী রেঞ্জের মনিরঝিল এলাকায় ১৩০, ২০ ও ১০ হেক্টরের বাগান দেখানো হয়েছে। অথচ বাস্তবে সেখানে বিস্তীর্ণ জায়গাজুড়ে নেই কোনো রোপণ করা গাছের সারি।
উখিয়ার ঘোনার ২০ হেক্টর, বাঘঘোনার ৩০০ হেক্টর, কচ্ছপিয়া বিটের ১৫০ হেক্টর এবং ঘিলাতলী বিটের ১৫৫ হেক্টর বাগানেও একই চিত্র। কোথাও কোথাও শুধু প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো কিছু চারা দেখা গেছে।
রামুর জোয়ারিয়ানালা রেঞ্জে ২০২২–২৩ অর্থবছরে ৫১০ হেক্টর বাগানের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তবে বনায়ন হয়েছে মাত্র ১৬০ হেক্টরে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরেও ৩৬২ হেক্টর বাগানে পর্যাপ্ত চারা পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন সংরক্ষকের কার্যালয় থেকে গঠিত তদন্ত কমিটি বাঘখালী রেঞ্জে বাগানের অস্তিত্ব না থাকার সত্যতা পেয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সেই প্রতিবেদন ধামাচাপা দেওয়া হয়। উল্টো জঙ্গল পরিষ্কার ও আগাছা কাটার নামে নতুন বরাদ্দ এনে আবারও কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়।
বন বিভাগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, পুরো অনিয়মের পেছনে ছিল কমিশনভিত্তিক ভাগ-বাটোয়ারার সংস্কৃতি।
অভিযোগ অনুযায়ী, লুটপাটের অর্থের ৬০ শতাংশ যেত ডিএফওর কাছে এবং বাকি ৪০ শতাংশ পেতেন সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ কর্মকর্তারা। এমনকি অডিট আপত্তিও বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে বন সংরক্ষক, চট্টগ্রাম অঞ্চল, বিগত অর্থবছরসমূহে সৃজনকৃত বাগানের সার্বিক অবস্থা জানিয়ে প্রতিবেদন চাইলেও রহস্যজনক কারণে তা পাঠানো হয়নি।
বরং যেসব জায়গায় বাগানের অস্তিত্বই নেই, সেসব স্থানও কাগজে বাগান দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
শুধু প্রকল্পের টাকা নয়, কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগে বদলি বাণিজ্য নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ।
বন বিভাগের একাধিক কর্মচারীর ভাষ্য, বিভাগে যোগ দেওয়ার পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রথমে ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্গম এলাকায় পোস্টিং দেওয়া হয়। এরপর টাকার বিনিময়ে বদলি করা হয় ‘সুবিধাজনক’ জায়গায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, একটি রেঞ্জে পোস্টিং পেতে গুনতে হয় ১০ লাখ টাকা, স্টেশনে ৮ লাখ এবং পছন্দের বিটে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। বিশেষ করে নলবিলা, মানিকপুর ও বাঘখালী বিট কাম চেক স্টেশনকে ঘিরে চলে সবচেয়ে বড় বাণিজ্য।
বন বিভাগের নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি কাকারা বিটে বদলি হওয়া এক ফরেস্ট গার্ডকে মাত্র দেড় মাসের মাথায় মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে নলবিলা স্টেশনে বদলি করা হয়।
লামা ও বান্দরবান থেকে আসা কয়েকজন কর্মীকেও বন রক্ষার দায়িত্ব না দিয়ে সরাসরি লাভজনক চেক স্টেশনে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে বলে তথ্য মিলেছে।
অভিযোগ রয়েছে, চেক স্টেশনগুলো ঘিরে গড়ে উঠেছে চাঁদাবাজির সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা আদায় করা হয় কাঠ, বাঁশ ও বালুবাহী গাড়ি থেকে।
সূত্রগুলো বলছে, লামা থেকে আসা টিপিযুক্ত কাঠবাহী গাড়ি থেকে নেওয়া হয় ৩ হাজার টাকা, অবৈধ কাঠের গাড়ি থেকে ৮ হাজার টাকা, বাঁশের গাড়ি থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা এবং অবৈধ বালুবাহী গাড়ি থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকা থেকেও একইভাবে আদায় করা হয় মোটা অঙ্কের চাঁদা।
এই চাঁদাবাজির সুযোগে প্রতিদিন উজাড় হচ্ছে ফাসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও মেধা কচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যানের শতবর্ষী মাদার গর্জন, তেলসুর ও সেগুন গাছ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন বিভাগের একাধিক কর্মচারী জানিয়েছেন, আউটসোর্সিং কর্মী ‘পনির’ এবং ডিএফওর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন মাঠ কর্মকর্তার মাধ্যমে পুরো সিন্ডিকেট পরিচালিত হয়।
বদলি, টেন্ডার ও মাসিক টাকা আদায়ের আধিপত্যকে কেন্দ্র করে বিভাগজুড়ে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। ইতিমধ্যে এক কর্মচারী চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কর্মচারীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর দুর্গম এলাকায় দায়িত্ব পালন করেও তারা ভালো পোস্টিং পান না। অথচ টাকার জোরে নতুন যোগ দেওয়া কর্মীরাও চলে যান সুবিধাজনক স্টেশনগুলোতে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন।
তিনি বলেন, “বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বনায়নের জন্য যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, তা আমি এখানে আসার আগেই শুরু হয়েছিল। আগের কর্মকর্তারা এটি বাস্তবায়ন করেছেন। এখানে আমার কোনো হাত নেই।”
বদলি বাণিজ্য ও চাঁদা আদায়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি এখন বাইরে কাজে ব্যস্ত আছি। পরে এ বিষয়ে কথা বলব।”
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দে বলেন, “প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ আছে কি না, তা আমার জানা নেই।
অভিযোগ থাকলে অবশ্যই খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমি নতুন এসেছি, বিষয়টি দেখতে হবে।”
বন বিভাগের ভেতর থেকেই এখন প্রশ্ন উঠছে—যে প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল পাহাড়ে সবুজ ফিরিয়ে আনা, সেই প্রকল্পের টাকায় কারা নিজেদের ভবিষ্যৎ সবুজ করল?
আর কেন পাহাড় রইল অনাবাদী, উজাড় ও নিঃস্ব?
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



