back to top

কাগজে-কলমে কাজ, টাকায় ভরা পকেট: মাস্টারমাইন্ড পিডি গফুর

রাবিপ্রবি প্রকল্পে দুর্নীতির সাম্রাজ্য

প্রকাশিত: ০৬ মে, ২০২৬ ১৪:৫৮

রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) উন্নয়ন প্রকল্পে ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আবদুল গফুরের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র ও নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রায় প্রতিটি ধাপেই নিয়ম ভঙ্গ, আর্থিক অসঙ্গতি এবং ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা ছিল প্রকট।

অভিযোগ রয়েছে, মাত্র একদিনের সাইট পরিদর্শনের জন্য ভ্যাট-ট্যাক্স বাদেও ৭৪ হাজার ৫৯৯ টাকার বিল দেখানো হয়েছে।

যেখানে বোট ভাড়া, গাড়ি ভাড়া, স্টেশনারি ও আপ্যায়ন খাতে অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক ব্যয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

একইভাবে ৮০ হাজার টাকা মূল্যের ৪টি টেবিল প্রতিটি ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেখিয়ে ক্রয়। নেইম প্লেট ও গেইট নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার আগেই প্রকৌশলীদের অনুমোদন ছাড়াই ২০২৫ সালের ২৪ জুন ৩৯ লাখ টাকা উত্তোলন এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না রেখে নিজের পছন্দের ঠিকাদার নিয়োগের অভিযোগও উঠেছে।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, কাজ পেতে এবং বিল উত্তোলনের ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের কমিশন দিতে বাধ্য করা হতো। কমিশন না দিলে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হতো, ফলে অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা জানান, ৪টি ভবন তৈরী করতে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তদারকি থাকার কথা থাকলেও প্রকল্প পরিচালকের প্রভাব খাটিয়ে শিক্ষা প্রকৌশলের মাধ্যমে বিল অনুমোদন ও আর্থিক লেনদেনে ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগও উঠেছে।

একটি নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ২ নভেম্বরের একদিনের ট্রেনিং এর জন্য ২৫ হাজার টাকা অগ্রীম উত্তোলন করা হয়েছে, পরবর্তীতে ১১ নভেম্বর প্রত্যার্পন নেওয়া হয়েছে। একইসাথে তিনি ডিএ ও উত্তোলন করেছেন।

কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান শেলটেক প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গেও নিয়মবহির্ভূত আর্থিক সমঝোতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। যেখানে নিয়মিত তদারকির বদলে মাসে বা দুই মাসে একবার পরিদর্শনে এসে বড় অঙ্কের ব্যয় দেখানো হতো।

নথিপত্রে আরও দেখা যায়, ট্রেনিং ও মিটিংয়ের নামে কর্মচারীদের নামে অগ্রিম অর্থ উত্তোলন করে পরে তা ফেরত দেখিয়ে নিজে ডেইলি অ্যালাউন্স (ডিএ) গ্রহণ।

আরেকটি নথি বিশ্লেষণে ভ্রমণ কিংবা ট্রেনিং এ যাওয়ার ক্ষেত্রে এমন অগ্রিম নেওয়ার বিধান নেই বলে জানা যায়। ঢাকায় যতবার মিটিং কিংবা গমন করেছেন ব্যাক্তিগত কাজে হলেও নিয়েছেন অগ্রিম এবং ডিএ।

একই খাতে একাধিকবার বিল উত্তোলন এবং ভুয়া ভাউচার তৈরি করে মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে আবদুল গফুরের বিরুদ্ধে।

এমনকি সরকারি বিধিমালায় অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও কর্মচারীদের নামে জোরপূর্বক অগ্রিম গ্রহণ করে সেই অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও সামনে এসেছে।

মাস্টারপ্ল্যান ফাইল অনুযায়ী, আবদুল গফুর নিজের নামে ১৯ লাখ ৬৮ হাজার ৫২২ টাকা ছাড়াও মার্শাল চাকমা, নিশান চাকমা, আবদুল হক, মনজুরুল ইসলামসহ একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামে কোটি টাকার বেশি অর্থ উত্তোলন করেছেন, যার অনেক ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্টদের স্বাক্ষর নেই।

প্রকল্প পরিচালনায় অদক্ষতার কারণে পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (ইআইএ) ছাড়াই এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ব্যতীত পাহাড় কেটে নির্মাণকাজ শুরু করায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে।

২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাঁকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়; পরে অর্থ খরচের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার সহ বিএনপি নেতাদের ব্যবহার করে আধিপত্য বিস্তার করার চেষ্টা করছেন গফুর। তবে উচ্চ আদালতে গিয়েও তিনি স্বস্তি পাননি বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আতিয়ার রহমান।

তিনি বলেন, ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন আদায়সহ নানা অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তবে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও আবদুল গফুরকে পাওয়া যায়নি, ফলে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি