চট্টগ্রাম রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে চাকরির নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে দুই কর্মচারীকে ঘিরে বিস্তৃত এক প্রতারণার চিত্র সামনে এসেছে।
মোহাম্মদ হোসাইন ও কামরুল ইসলাম। পাহাড়তলীর সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরের শিপিং ও পরিদর্শন বিভাগে ম্যাটেরিয়াল চেকার পদের কর্মরত এই দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তারা কোটি কোটি টাকা আদায় করেছেন। পরে সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে গা-ঢাকা দিয়েছেন।
সরেজমিনে দপ্তরে গিয়ে দেখা যায়, অভিযুক্ত দুইজনই কর্মস্থলে অনুপস্থিত। একজন প্রায় ৮ মাস, অন্যজন ৩ মাস ধরে কোনো ধরনের ছুটি ছাড়াই অফিসে আসছেন না।
আরও পড়ুন
অথচ তাদের বিরুদ্ধে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়লেও দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ দীর্ঘদিন ছিল না।
এতে প্রশ্ন উঠেছে—প্রতারণার এই বিস্তার কি শুধুই ব্যক্তিগত, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা?
দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে,লিখিতভাবে অভিযোগ দিয়ে অন্তত এক ডজন ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, চাকরি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে তাদের কাছ থেকে ৩ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। একাধিক জেলার সাধারণ মানুষ, এমনকি রেল কর্মচারীদের আত্মীয়স্বজনও এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ বছরের পর বছর ধরে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরছেন। কেউ মামলা করেছেন, কেউ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্বারস্থ হয়েছেন। তবু টাকা ফেরত বা প্রতিকার মেলেনি। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশও কয়েকবার অভিযুক্তদের খোঁজে দপ্তরে এসেছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তরা নিজেদের প্রভাবশালী হিসেবে পরিচয় দিয়ে চাকরি নিশ্চিত করার আশ্বাস দিতেন। কখনো বদলি, কখনো নিয়োগ, আবার কখনো বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়া হতো।
লেনদেনের পর ধীরে ধীরে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া—এটাই ছিল তাদের মূল কৌশল।
কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঈদযাত্রার টিকিট ‘ম্যানেজ’ করে দেওয়ার নামেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া এনআইডি সংশোধন, চাকরি পাইয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেন তিনি—এমন অভিযোগ করেছেন তার সহকর্মীরাও।
একাধিক অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে, প্রতারণার অর্থ দিয়ে হোসাইন চট্টগ্রাম নগরের আলকরণ এলাকায় চারগন্ডা জমি কিনেছেন এবং একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর আগ্রাবাদ চৌমুহনীর কর্ণফুলী মার্কেটে চারটি দোকান আছে হোসাইনের। এছাড়াও সদরঘাট রোডে ‘আমিন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি, বিটিএল লুব্রিকেন্টস্ ও ঈগলু আইসক্রিমে’ ডিলারশিপ এবং কোতোয়ালীতে ‘আমির এন্টারপ্রাইজ’ নামক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে হোসাইনের।
একজন নিম্নপদস্থ কর্মচারীর এই ধরনের সম্পদ অর্জন নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধেও ব্যক্তিগতভাবে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার একাধিক অভিযোগ রয়েছে। সহকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত তার প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে দাবি।
এদিকে দুজনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, একের পর এক অভিযোগ জমা পড়া—এসব সত্ত্বেও কেন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, প্রশ্ন ভুক্তভোগীদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরএনবির এক হাবিলদার জানান, আত্মীয়ের চাকরির জন্য তিনি হোসাইনকে ৯ লাখ টাকা দিয়েছেন। পরে চাকরিতো হয়নি বরং ৫ বছর ধরে ধর্ণা দিয়েও সেই টাকা মিলছে না।
এরকম আরও অনেক ভুক্তভোগী প্রতিদিন রেলের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এসে টাকার জন্য কান্না করছেন বলেও জানিয়েছেন উধাও কর্মকর্তাদের সহকর্মীরা।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন একটাই—“টাকা ফেরত পাবো কবে?”
কেউ ৫ বছর ধরে অপেক্ষা করছেন, কেউ জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে নিঃস্ব। তাদের কাছে প্রশাসনিক প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ এবং ন্যায়বিচার।
অভিযোগ রয়েছে, রেলের কিছু কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করার মাধ্যমে তারা দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চাকরির নামে প্রতারণা শিকার হওয়া তিন যুবক মো. সিরাজুল ইসলাম, নূর আলম ও মো. আব্দুর রাজ্জাক সুমন হোসাইনের বিরুদ্ধে রেলের জিএম’র (পূর্ব) দপ্তরে লিখিতভাবে অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছেন জানিয়ে জেলা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (পরিদর্শন) এসএম আল মুহিদ বলেছেন দুজনের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
চট্টগ্রাম রেলের দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, বৃহত্তর সংকটের প্রতিফলন। যেখানে দুর্বল নজরদারি, জবাবদিহির অভাব এবং প্রভাবশালী সংস্কৃতি মিলিয়ে সাধারণ মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চয়তার দিকে।
এখন দেখার বিষয়, এই অভিযোগ কি সত্যিই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দিকে যায়, নাকি আগের মতোই হারিয়ে যায় অভিযোগের ভিড়ে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



