back to top

ডাকেও এলেন না মনজুর—এনসিপির পরিকল্পনায় ভাঙন!

প্রকাশিত: ০৯ মে, ২০২৬ ১৫:১২

চট্টগ্রামের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরির বড় পরিকল্পনা নিয়েই মাঠে নেমেছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

লক্ষ্য ছিল একটাই—চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক মেয়র এম মনজুর আলম-কে দলে টেনে এনে নগর রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান গড়া। কিন্তু সেই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মনজুর আলমই শেষ পর্যন্ত সাড়া দেননি।

বরং তার অনুপস্থিতিতেই শেষ করতে হয়েছে বহুল আলোচিত যোগদান অনুষ্ঠান—যা এনসিপির জন্য স্পষ্ট এক ধাক্কা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

সূত্র জানায়, মনজুর আলমকে এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগর শাখার আহ্বায়ক করা এবং ভবিষ্যৎ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এই প্রস্তাব নিয়ে তার উত্তর কাট্টলীর বাসভবনে যান দলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। সেই বৈঠকের পর থেকেই এনসিপি নেতারা আশাবাদী হয়ে ওঠেন যে মনজুর আলম তাদের দলে যোগ দিচ্ছেন।

এই বিশ্বাসের ওপর ভর করেই চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে বড় পরিসরে যোগদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে নাটকীয় মোড় নেয় পুরো পরিস্থিতি।

অনুষ্ঠানের আগের দুই দিন থেকে মনজুর আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। একপর্যায়ে নিজের মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেন।

শুধু তাই নয়, উত্তর কাট্টলীর নিজ বাসা থেকেও সরে যান তিনি। এতে করে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এমনকি পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও তাকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হন বলে জানা গেছে।

অবশেষে যাকে কেন্দ্র করে পুরো আয়োজন, সেই মনজুর আলমকে ছাড়াই অনুষ্ঠান শেষ করতে বাধ্য হয় এনসিপি।

ঘটনাটি শুধু একটি অনুপস্থিতি নয়—বরং রাজনৈতিক বার্তার দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এনসিপির এই অনুষ্ঠানে বিএনপি-জামায়াত বা অন্য কোনো বড় দলের উল্লেখযোগ্য কোনো নেতার উপস্থিতি দেখা যায়নি।

যাদের বরণ করা হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই ছিলেন অপরিচিত। ফলে প্রত্যাশার বিপরীতে অনুষ্ঠানটি হয়ে পড়ে সাদামাটা এবং প্রভাবহীন। যোগদান অনুষ্ঠানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।

মনজুর আলমের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অতিরিক্ত যোগাযোগ ও চাপের কারণেই তিনি বিরক্ত হয়ে ফোন বন্ধ রেখেছেন এবং বাসা থেকেও সরে গেছেন।

পরিবারের এক সদস্যের ভাষায়, ‘ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাউকে কোনো দলে নেওয়া যায় না।’ তারা আরও অভিযোগ করেন, একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে তাকে এনসিপিতে ঠেলে দিয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে।

অন্যদিকে এনসিপি নেতারা বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখানোর চেষ্টা করছেন। দলের চট্টগ্রাম মহানগর সমন্বয়কারী রিদুয়ান হৃদয় দাবি করেন, মনজুর আলমের যোগদানের বিষয়ে তারা অবগত নন এবং এতে তারা হতাশও নন। বরং তাদের মতে, অনুষ্ঠান সফল হয়েছে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এতে যোগ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, এনসিপিতে সাবেক প্রধান উপদেষ্টার একজন আত্মীয় যোগদান করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মালেকা আফরোজ যোগ দিয়েছেন। লাভ বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী যোগদান করেছেন।

তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী মুখ মনজুর আলম। একসময় তিনি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী-এর ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

পরবর্তীতে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচন করে তাকেই পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন—যা তাকে ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক অবস্থানে নিয়ে যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও তিনি এখনো নিজ অবস্থান পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করেননি। বরং সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীদের পক্ষেই তাকে সক্রিয় দেখা গেছে।

সব মিলিয়ে স্পষ্ট—মনজুর আলমকে ঘিরে এনসিপির যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা ছিল, তা বাস্তবতার মুখে টিকেনি।

বরং এই ঘটনাই প্রমাণ করেছে, চট্টগ্রামের জটিল রাজনৈতিক সমীকরণে এখনো মনজুর আলম একটি স্বাধীন ও হিসাবি অবস্থান ধরে রেখেছেন—যেখানে তাকে টেনে আনা এত সহজ নয়।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি