একরামুল হক হত্যা: হাসিনা-কাদের-বেনজীরসহ ১১ জনের মামলায় আজ কী হচ্ছে?

বন্দুকযুদ্ধের সেই ‘অডিও টেপ’ থেকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:৫৩

২০১৮ সালের ২৬ মে, গভীর রাত। টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাতাসে তখন ভেসে এসেছিল একটি অবরুদ্ধ কণ্ঠের করুণ আর্তনাদ, যা পরবর্তীতে কেঁপে দিয়েছিল পুরো দেশকে।

বন্দুকযুদ্ধ’ নামের এক বহুল চর্চিত নাটকের মধ্য দিয়ে নিভে গিয়েছিল টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি একরামুল হকের জীবনপ্রদীপ।

দীর্ঘ ৬ বছর পর, সেই বিচারহীনতার বন্ধ দরজায় আজ আনুষ্ঠানিকভাবে হানা দিয়েছে আইনি প্রক্রিয়া।

কক্সবাজারের বিতর্কিত ওই বন্দুকযুদ্ধে একরামুল হক হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১ জন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন (চার্জ গঠন) নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন প্যানেল এ শুনানির নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

বিচার প্রক্রিয়ার এক ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়েছে এই মামলাটি। বর্তমানে আদালতের হাতে গ্রেপ্তার রয়েছেন চার প্রভাবশালী আসামি-কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক বিতর্কিত সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব আলম এবং র‍্যাবের সাবেক মহাপরিচালক কর্নেল (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে) আনোয়ার লতিফ খান।

আসামিপক্ষের আইনজীবী তবারক হোসেনের যুক্তিতর্ক শেষে আজ মিফতাহ উদ্দিন, মাহবুব আলম ও আনোয়ার লতিফের জামিন আবেদনের ওপরও আদেশের দিন ধার্য রয়েছে।

অন্যদিকে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মামলার বাকি সাত আসামি পলাতক। এই তালিকায় রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ, মেজর (অব.) রুহুল আমিন, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আশেকুর রহমান এবং ডিজিএফআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার নাজমুস সাকিব মাহমুদ।

২৫ আগস্ট আদালতের নির্দেশে দুটি জাতীয় দৈনিকে তাদের আত্মসমর্পণের নোটিশ জারি করা হলেও ৭ সেপ্টেম্বর হাজিরার দিনে তারা উপস্থিত হননি।

ফলে আইনানুযায়ী তাদের অনুপস্থিতিতেই রাষ্ট্রনিযুক্ত (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবীর মাধ্যমে বিচারিক কাজ এগিয়ে নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন পক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছে।

যার মধ্যে রয়েছে-২০১৮ সালের ২৬ মে রাত সাড়ে ১০টার দিকে টেকনাফের কিরণতলীর হোটেল নেটংয়ের সামনের সড়ক থেকে একরামুলকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়া।রাত ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নোয়াখালিয়া পাড়ায় মেরিন ড্রাইভের নির্জন সাগরতীরে পরিকল্পিতভাবে গুলি করে হত্যা এবং অপরাধ সংঘটনে সরাসরি সম্পৃক্ততা, প্ররোচনা, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা এবং শীর্ষ পর্যায় থেকে হত্যার নির্দেশ প্রদান।

বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ একটি বিতর্কিত অধ্যায়। তবে একরামুল হক হত্যাকাণ্ডটি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

হত্যাকাণ্ডের পর ফাঁস হওয়া একটি অডিও কল রেকর্ড দেশের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল, যেখানে একরামুলের স্ত্রী ও কন্যাদের আকুতি এবং ফোনের অপর প্রান্তে গুলির শব্দ শিউরে দিয়েছিল সবাইকে।

এতদিন ধরে যা ছিল কেবল ‘বেআইনি বিচারবর্হিভূত হত্যা’, তা আজ আইসিটির কাঠগড়ায় স্থান পেয়েছে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে।

আজকের এই শুনানি বিচারহীনতার যে সংস্কৃতির সূচনা হয়েছিল, তার প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতের এক নতুন অধ্যায়। ট্রাইব্যুনাল আজ জামিন আবেদন ও চার্জ গঠনের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত দেন, সেদিকেই এখন নজর পুরো দেশের।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি