back to top

দেশের ৯০ শতাংশেরও বেশি বৈদেশিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু চট্টগ্রাম বন্দর

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৮:১৭

বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম আধুনিকায়নের জন্য সরকার বিভিন্ন স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

বে-টার্মিনাল, পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল, কর্ণফুলী ড্রেজিং, ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এই সব মিলিয়ে গতি আসছে দেশের আমদানি-রপ্তানি খাতে।

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের ৯০ শতাংশেরও বেশি বৈদেশিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় এর উন্নয়ন অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

বে-টার্মিনাল প্রকল্পে তৈরি হচ্ছে প্রায় ২.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ জেটি, আধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন ও মালামাল ওঠানামার জন্য স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের শেষ দিকে এবং এটি বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে চালু রয়েছে।

পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় কাজ করছে একটি দেশি-বিদেশি কনসোর্টিয়াম, যারা আন্তর্জাতিকমানের অপারেশন চালু করেছে। কর্ণফুলী নদীতে চলছে টেকনিক্যাল ড্রেজিং, যাতে নদীর গভীরতা বৃদ্ধি পেয়ে বড় জাহাজ চলাচল সহজ হয়।

নৌপথ উন্নয়নের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম-ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে নৌযান চলাচলের জন্য বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাগজপত্র জমা, বিলিং, কাস্টমস কার্যক্রম ও জাহাজ নির্ধারণ করা হচ্ছে।

পোর্ট কমিউনিটি সিস্টেম এবং অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড চালুর ফলে অপারেশন দ্রুততর ও স্বচ্ছ হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদারে বন্দরে স্থাপন করা হয়েছে স্মার্ট গেইট, হাই-রেজুল্যুশন ক্যামেরা, এক্স-রে স্ক্যানার ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা।

কাস্টমস কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং স্ক্যানিং ব্যবস্থা জোরদার হওয়ায় এখন দ্রুত পণ্য ছাড় হচ্ছে।

রেল সংযোগ উন্নয়নের মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ও উত্তরবঙ্গে মালবাহী ট্রেন চলাচল শুরু করার উদ্যোগ চলছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্দরের আধুনিকায়ন বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা ও বিনিয়োগ আকর্ষণ বাড়াবে। ব্যবসায়ীরা উন্নয়ন কাজের প্রশংসা করলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি ও সমন্বয়ের আহ্বান জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি -এর পরিচালক মো. কামাল হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দর হবে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান লজিস্টিক হাব।

সরকার এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ২০২৭ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে শেষ হবে। দেশবাসীর প্রত্যাশা, সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে উঠবে দক্ষিণ এশিয়ার ‘গেটওয়ে টু গ্লোবাল ট্রেড’।

বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালনা ও উন্নয়ন নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

এই চুক্তির আওতায় চট্টগ্রাম বন্দরের বে-টার্মিনাল ও পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য ৩০ বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয়েছে। ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বব্যাপী ৭৮টিরও বেশি সমুদ্রবন্দর পরিচালনা করে, যার অভিজ্ঞতা চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে সরকার।

চুক্তি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড শুধু অবকাঠামো নয় বরং প্রযুক্তিগত, মানবসম্পদ ও নিরাপত্তার দিক থেকেও বন্দরের মানোন্নয়নে বিনিয়োগ করবে। প্রথম ধাপে পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল পরিচালনার মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম শুরু হবে।

ডিপি ওয়ার্ল্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা বন্দর পরিচালনায় অত্যাধুনিক অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার এই বিনিয়োগ থেকে একটি উল্লেখযোগ্য রাজস্ব অংশ পাবে এবং কর্মসংস্থান বাড়বে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে আমরা আন্তর্জাতিকমানের বন্দর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংযুক্ত হলাম।

সরকারি সূত্র জানায়, চুক্তি স্বচ্ছতা, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে সম্পাদিত হয়েছে। উচ ডড়ৎষফ বাংলাদেশের সঙ্গে লজিস্টিক পার্টনারশিপ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে, যার আওতায় মোংলা ও পায়রা বন্দরের দিকেও তাদের দৃষ্টি রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর মো: নাহিদ মোস্তফা উপ-সচিব জানিয়েছেন, এই ধরনের বিদেশি বিনিয়োগ আমাদের অর্থনীতিতে আস্থা ফেরাচ্ছে এবং বন্দর সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানিতে গতি আসবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড–এর মতো অভিজ্ঞ অপারেটর যুক্ত হওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দর দক্ষিণ এশিয়ার একটি টপ লজিস্টিক হাবে পরিণত হতে পারবে।

ব্যবসায়ীদের অনেকেই এই চুক্তিকে সময়োপযোগী এবং কার্যকর বলেছেন, তবে তারা সরকারকে চুক্তির বাস্তবায়ন ও স্বচ্ছ তদারকি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। ডিপি ওয়ার্ল্ড আগামী ৩ বছরে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।

এই বিনিয়োগ থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য হ্যান্ডলিং, গতি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।