back to top

সিএসআর তহবিল/স্বল্প মেয়াদেই বিতর্কের কেন্দ্রে আহসান মনসুর

সংস্কারের কথা, অনিয়মের অভিযোগ-দ্বৈত বাস্তবতায় মনসুরের মেয়াদ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৩ এপ্রিল, ২০২৬ ০৭:৩৭

বিশেষ প্রতিবেদন : বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য বিদায়ী গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের দায়িত্বকাল ছিল স্বল্প, কিন্তু বিতর্কে পরিপূর্ণ। ইতিহাসে স্বল্পতম মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেও সবচেয়ে বেশি বিতর্কে জড়ানো গভর্নরদের একজন হয়ে উঠেছেন ড. আহসান এইচ মনসুর।

দায়িত্বের সময়কাল ছিল মাত্র এক বছর ছয় মাস ১৭ দিন। কিন্তু এই সময়েই করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল ব্যবহারে অনিয়ম, স্বার্থের সংঘাত এবং প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে।মনসুর

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা ও নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, তার আমলে সিএসআর তহবিল ব্যবহারে পূর্ববর্তী ধারা থেকে কিছু ক্ষেত্রে বিচ্যুতি ঘটেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অতীতে সিএসআর তহবিল সাধারণত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পে ব্যয় করা হলেও মনসুরের সময়কালে এ তহবিল থেকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অনুদান দেওয়ার প্রক্রিয়া, অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং অনুদান বিতরণ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

২০২৫ সালে জুলাইযোদ্ধাদের জন্য ২৫ কোটি টাকার ফান্ড ম্যানেজ করে আহত ও নিহত পরিবারকে সহযোগিতা করা হয়েছে। এই সুযোগ ব্যবহার করে নিজের পরিচিতদের মধ্যে এই ফান্ডের টাকা বিতরণ করেছেন আহসান মনসুর।

তবে এসব বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।মনসুর

তড়িঘড়ি অনুদান অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে মতভেদ ও প্রশ্ন:
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রচলিত চর্চা অনুযায়ী, সিএসআর তহবিল সাধারণত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা হয় এবং এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একটি অংশের দাবি, কিছু অনুদানের ক্ষেত্রে এই যাচাই প্রক্রিয়ার সময়সীমা তুলনামূলকভাবে কম ছিল।

অনুসন্ধানে নথি অনুযায়ী উঠে এসেছে, চুয়াডাঙ্গায় গভর্নরের ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত খলিল-মালিক ফাউন্ডেশনকে সিএসআর তহবিল থেকে তিন কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা যাচাই না করেই দ্রুত অর্থ ছাড় করা হয়েছে।

এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,“সাধারণত এ ধরনের বড় অনুদানে দীর্ঘ যাচাই হয়। কিন্তু এখানে অস্বাভাবিক তাড়াহুড়া ছিল।”

নীতিমালা ভেঙে অনুদান?
একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে সাধারণত বেসরকারি বা এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহায়তা দেওয়া হলেও সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুদানের নজির খুবই কম।

অথচ অভিযোগ রয়েছে, গভর্নরের ব্যক্তিগত সংযোগ বিবেচনায় নীলফামারী উচ্চ বিদ্যালয়কে অনুদান দেওয়া হয়। যা নিয়ে অভ্যন্তরীণ আপত্তিও উপেক্ষিত হয়।

আরও অভিযোগ, চুয়াডাঙ্গা উচ্চবিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে ২৫ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের উদ্বোধনে গভর্নর নিজে স্ত্রীসহ উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া একইভাবে টাঙ্গাইলের করটিয়ায় তার মালিকানাধীন বাগানবাড়ির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মার্থা-লিন্ডস্ট্রম নূরজাহান বেগম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। যেখানে তিনি নিজেই পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি। সেখানে সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এটিকে “স্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত” হিসেবে দেখছেন।

অভিযোগ উঠেছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা-প্রয়োজনীয়তা যাচাইয়ের যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়নি এবং দ্রুত অর্থ ছাড়ের জন্য অভ্যন্তরীণ চাপ ছিল।

তবে অন্য একটি সূত্র বলছে, জরুরি সামাজিক প্রয়োজন বিবেচনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার নজির আগেও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ঘটনায় ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

প্রতিষ্ঠান নির্বাচন নিয়ে আলোচনা:
কিছু অনুদান এমন প্রতিষ্ঠানেও গেছে, যেগুলোর সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর ব্যক্তিগত পরিচয় বা সম্পৃক্ততার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনসহ কয়েকটি প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা হয়।

তবে এসব ক্ষেত্রে সরাসরি অনিয়ম হয়েছে—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনো পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলছেন,বিষয়টি “সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত” হিসেবে দেখা যেতে পারে, যা নীতিগতভাবে সংবেদনশীল।

নীতিমালা ও বাস্তব প্রয়োগ:
সাধারণত সিএসআর তহবিল বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে বেশি ব্যবহৃত হলেও, কিছু ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানে সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এনিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে মতভেদ ছিল বলে জানা গেছে।

কিছু কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তারা লিখিত মতামত দিয়েছিলেন। তবে সেই মতামত সব ক্ষেত্রে গৃহীত হয়নি।

নীতিমালা লঙ্ঘন হয়েছে কি না,তা নির্ধারণে কোনো আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁস প্রসঙ্গ:
গুরুতর একটি অভিযোগ এসেছে বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ফ্রিজকৃত ব্যাংক হিসাবের তথ্য নিয়মিতভাবে গভর্নর সচিবালয়ে সরবরাহ করা হতো এবং সেগুলোর অপব্যবহারের মাধ্যমে একটি চক্র সুবিধা নিত। ফ্রিজকৃত হিসাবসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহের এ পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

যদিও এসব অভিযোগের আনুষ্ঠানিক প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও বিষয়টি আর্থিক খাতে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিলাসবহুল গাড়ি কেনা, ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন?
নীতিমালা উপেক্ষা করে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল গাড়ি কেনার অভিযোগও উঠেছে সাবেক এ গভর্নরের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, যথাযথ দরপত্র ছাড়াই এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রচলিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে এবিষয়েও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত ফলাফল প্রকাশ পায়নি।

দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান,উদ্যোগ ও ফলাফল
মনসুর দায়িত্ব গ্রহণের পর ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেন। অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশে গঠন করা হয় একাধিক যৌথ তদন্ত কমিটি। তবে দেড় বছর পরও বড় কোনো দৃশ্যমান ফলাফল না আসায় প্রশ্ন উঠেছে কার্যকারিতা নিয়ে।

সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, এসব উদ্যোগের দৃশ্যমান ফলাফল এখনো সীমিত। বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারে। কেউ কেউ মনে করেন, তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান থাকায় ফল পেতে সময় লাগতে পারে।

দ্বৈত বাস্তবতার প্রশ্ন
ড. মনসুরের মেয়াদ যেন এক দ্বৈত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি—একদিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা, অন্যদিকে নিজেকেই ঘিরে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন একটাই—সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তা কি বাস্তবে রূপ পেয়েছে, নাকি বিতর্কেই ঢাকা পড়ে গেছে?

সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য:
এই বিষয়ে জানতে সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার মন্তব্য পাওয়া গেলে তা যুক্ত করা হবে।

সব মিলিয়ে, ড. মনসুরের দায়িত্বকাল এক ধরনের মিশ্র চিত্র তুলে ধরে—একদিকে সংস্কারমূলক উদ্যোগ, অন্যদিকে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন।

এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উত্থাপিত বিষয়গুলো আনুষ্ঠানিক তদন্তে কীভাবে মূল্যায়িত হয় এবং ভবিষ্যতে সিএসআর তহবিল ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হয়।

উল্লেখ্য : বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে ১৯৭২ সাল থেকে ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ১২ জন গভর্নর দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে কম সময় দায়িত্ব পালন করেছেন ড. আহসান এইচ মনসুর। তার দায়িত্বকাল মাত্র এক বছর ছয় মাস ১৭ দিন।

মনসুর স্বল্প সময় দায়িত্ব পালন করলেও নানা বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। তার বিরুদ্ধে জমেছে অভিযোগের পাহাড়।

এর মধ্যে ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল ব্যবহারে তার কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা। এ ক্ষেত্রে সাবেক এই গভর্নরের বিরুদ্ধে তহবিল তছরুপ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে।

তার সময়কালে শিল্পগোষ্ঠীগুলোর ওপর কড়া নজরদারি ও তদন্তের আবহে নতুন বিনিয়োগে ভাটা পড়ে, পুঁজিবাজারে তৈরি হয় স্থবিরতা।

প্রশ্ন উঠেছে, যুদ্ধের ঢাকঢোল ছিল জোরালো, কিন্তু ফল কোথায়? এই বিতর্কের মধ্যেই মেয়াদ শেষ হওয়ার আড়াই বছর আগেই গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তাকে সরিয়ে দিয়েছে সরকার।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি