চট্টগ্রাম থেকে কারা হচ্ছেন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সম্ভাব্য দুই সংসদ সদস্য—তা নিয়ে দলটির ভেতরে-বাইরে চলছে তুমুল আলোচনা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পেতে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে ৩৬ জন নারী নেত্রী আবেদন করেছেন, যাদের সাক্ষাৎকার ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাজধানীর গুলশান-এ বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বিকেল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলে এই সাক্ষাৎকার কার্যক্রম। মনোনয়ন বোর্ডে সভাপতিত্ব করেন তারেক রহমান।
দলীয় সূত্র বলছে, এই ৩৬ জনের মধ্য থেকেই চট্টগ্রাম অঞ্চলের জন্য সম্ভাব্য দুজনকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। যদিও শেষ পর্যন্ত কারা নির্বাচিত হবেন, তা নির্ভর করছে একাধিক বিবেচনার ওপর।
ত্যাগ বনাম যোগ্যতা—কোনটি এগিয়ে?
দলের সংশ্লিষ্ট নেতারা জানিয়েছেন, এবারের মনোনয়নে শুধু আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা নয়, বরং শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সংসদে কার্যকরভাবে কথা বলার দক্ষতাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মনোনয়নপ্রত্যাশীরা বলছেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগ, মামলা-হামলা সহ্য করা এবং কঠিন সময়ে রাজপথে সক্রিয় থাকার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার:
মনোনয়ন দৌড়ে আবেগঘন কিছু গল্পও সামনে এসেছে। মনোনয়নপ্রত্যাশী নেত্রীরা জানিয়েছেন, দলের দুঃসময়ে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা, মামলা-হামলা সহ্য করা এবং দীর্ঘদিন সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
অন্যদিকে, দলের শীর্ষ নেতারা বলেছেন, ত্যাগের পাশাপাশি সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারার মতো জ্ঞান, দক্ষতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
কারা রয়েছেন দৌড়ে?
সাক্ষাৎকার দেওয়া ৩৬ নেত্রীর মধ্যে রয়েছেন— জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় নেত্রী ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা দলের সভাপতি মনোয়ারা বেগম মনি, সাধারণ সম্পাদক জেলী চৌধুরী, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দস্তগীর চৌধুরীর স্ত্রী ডা. কামরুন নাহার দস্তগীর, জাসাসের কেন্দ্রীয় সহ-সম্পাদক নাজমা সাঈদ, দক্ষিণ জেলা মহিলা দলের সভাপতি জান্নাতুল নাঈম চৌধুরী রিকু, গুম হওয়া বিএনপি নেতা সিরাজ চেয়ারম্যানের স্ত্রী সুলতানা পারভীন।
এ ছাড়াও রয়েছেন বেসরকারি কারা পরিদর্শক মোছাম্মৎ সুলতানা বেগম (আঁখি সুলতানা), প্রয়াত বিএনপি নেতা কাস্টম জালাল উদ্দিন আহমেদের কন্যা সায়মা আহমেদ, ডা. ফারহানা আফরোজ চৌধুরী, পটিয়ার সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আফরোজা বেগম, মহিলা শ্রমিক দল নেত্রী শাহনেওয়াজ চৌধুরী, এসএম নুসরাত ইকবাল, নাছিমা আক্তার চৌধুরী, আইরীন পারভীন খন্দকার, ফরিদা আকতার, ড. নাছিমা ইসলাম চৌধুরী বৃষ্টি, রীনা আকতার, দিল আফরোজ সুলতানা চৌধুরী, নাসিমা সাফা কামাল, বিবি হাজেরা সাদাত আলম, নাজনীন মাহমুদ, গোলতাজ বেগম, অ্যাডভোকেট কানিজ কাউসার চৌধুরী, মাহমুদা সুলতানা চৌধুরী ঝর্ণা, ডা. ফারাহনাজ মাবুদ (সিলভী), নুরী আরা সাফা, মেহেরুন নেছা নার্গিস, ফারহানা ইয়াসমিন চৌধুরী আঁখি, রওশন আক্তার, চসিকের সাবেক কাউন্সিলর জেসমিনা খানম, জিনাতুন নেছা জিনু, ইয়াসমিন খান, ডা. লুসি খান, অ্যাডভোকেট হাসনা হেনা ও অ্যাডভোকেট আয়েশা আক্তার সানজি।
এদের মধ্যে বহু নেত্রী রয়েছেন, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং সংগঠনিক সক্রিয়তা—সবকিছু মিলিয়ে প্রতিযোগিতা হয়ে উঠেছে অত্যন্ত জমজমাট।
মনোনয়ন প্রত্যাশী নেত্রীদের প্রত্যাশা ও ভাবনা :
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় নেত্রী ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা বলেন, “আমি সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিতে চেয়েছিলাম। দল মনোনয়ন না দিলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি।”
মনোনয়নপ্রত্যাশী নগর মহিলা দলের সহ–সভাপতি মোছাম্মৎ সুলতানা বেগম (আঁখি সুলতানা) বলেন, দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে দলের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। আন্দোলন–সংগ্রামে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি দলের প্রতিটি কর্মসূচিতে রাজপথে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর প্রত্যাশা, এই দীর্ঘ ত্যাগ ও শ্রম দল যথাযথভাবে মূল্যায়ন করবে।
জাসাসের তথ্য ও প্রযুক্তি সম্পাদক নাজমা সাঈদ বলেন, “দলের জন্য ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছি, ব্যক্তিগত ক্ষতিও হয়েছে। তবুও আদর্শ থেকে সরে যাইনি।”
চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা দলের দপ্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট আয়েশা আকতার সানজী বলেন, একজন আইনজীবী হিসেবে আদালতে যেমন সক্রিয় ছিলেন, তেমনি দলীয় কর্মী হিসেবেও রাজপথে আন্দোলন–সংগ্রামে সবসময় সম্পৃক্ত থেকেছেন। দলের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি মিছিল, সমাবেশ ও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছেন বলে জানান তিনি।
প্রার্থিতা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, সংসদ মূলত আইন প্রণয়নের স্থান হওয়ায় সেখানে যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদেরই প্রতিনিধিত্ব করা উচিত। দলের প্রতি ত্যাগের পাশাপাশি প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতাকেও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, নবীন ও প্রবীণের মধ্যে যারা বেশি সক্ষম, তাদের মধ্য থেকেই বাছাই করা উচিত।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর জেসমিনা খানম আশাবাদী কণ্ঠে বলেন, “দলের সুখ-দুঃখে পাশে থেকেছি। মানুষের জন্য কাজ করেছি—মনোনয়ন পাব বলে আশা করছি।”
নগর মহিলা দলের সভাপতি মনোয়ারা বেগম মনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন–সংগ্রামে যুক্ত থাকার পাশাপাশি একাধিকবার মামলা–হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তিনি। এসব ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন দল করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
একই ধরনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জেলী চৌধুরীও।
প্রয়াত বিএনপি নেতা কাস্টম জালাল উদ্দিন আহমেদের কন্যা সায়মা আহমেদ বলেন, “বাবার হাত ধরে রাজনীতি শিখেছি। তাঁর মতোই নেতাকর্মীদের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি।”
দক্ষিণ জেলা মহিলা দলের সহ–সভাপতি আফরোজা বেগম বলেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর তাকে ৭২ ঘণ্টা নিজ বাড়িতে অবরুদ্ধ করে রাখা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
এছাড়া মইজ্জারটেক এলাকায় তার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনাও উল্লেখ করেন। এসব অভিজ্ঞতার পরও আন্দোলন–সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দল তার এই ত্যাগের মূল্যায়ন করবে বলে তিনি আশা করেন।
অন্যদিকে, গুম হওয়া বিএনপি নেতা সিরাজুল ইসলামের স্ত্রী সুলতানা পারভীন বলেন, “বিএনপি করার কারণে স্বামীকে হারিয়েছি। এখন দলের সুসময়—আশা করি মূল্যায়ন পাব।”
সংখ্যার অঙ্কে ‘সহজ জয়’?
দলীয় সূত্র জানায়, সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জোটের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৩৬টি আসন। মনোনয়ন বোর্ড যদি সমসংখ্যক প্রার্থী চূড়ান্ত করে, তাহলে তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের তফসিল ঘোষণা করেছে। মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন: ২১ এপ্রিল। যাচাই-বাছাই: ২২–২৩ এপ্রিল এবং ভোটগ্রহণ: ১২ মে।
চট্টগ্রাম থেকে সেই ‘ভাগ্যবান’ দুই নারী কে হচ্ছেন, যাদের হাতে উঠবে সংসদের টিকিট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের মনোনয়ন শুধু আনুগত্য নয়—দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।



